header ads

স্বদেশপ্রেম ।। অষ্টম শ্রেণি ।। (মাধ্যমিক) - বাংলা ব্যকরণ ও নির্মিতি - নির্মিতি।।।। NCTB BOOK।। Class 8।।

স্বদেশপ্রেম


১. ভূমিকা:
স্বদেশপ্রেম বা দেশপ্রেম হলো মানুষের মনের খুব সুন্দর একটি গুণ। জন্ম থেকেই মানুষের মধ্যে এই ভালোবাসা থাকে। ভালো শিক্ষা ও সুন্দর সংস্কৃতির চর্চা করলে এই গুণ আরও বাড়ে। আমরা যেখানে জন্মাই, সেখানকার আলো, জল, বাতাস, পশুপাখি আর সবুজ প্রকৃতির সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। জন্মভূমির প্রতিটি ধূলিকণাকে আমাদের কাছে সোনার চেয়েও দামি মনে হয়। আমরা তখন মনে মনে বলি:
মিছা মণি মুক্তা-হেম
স্বদেশের প্রিয় প্রেম
তার চেয়ে রত্ন নাই আর।
মানুষের এই ভালো লাগাই হলো স্বদেশপ্রেম। দেশপ্রেম আমাদের দেশের ভালো ও উন্নতির জন্য সব কাজ ঠিকঠাক ও নিয়ম মেনে করতে শেখায়। তাই এই বিশেষ গুণটি যদি আমরা সবাই ঠিকমতো চর্চা করি, তবে দেশ, জাতি এবং সারা বিশ্বের অনেক ভালো হবে।


২. স্বদেশপ্রেম বা দেশপ্রেম কী:
স্বদেশপ্রেম মানে হলো নিজের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি গভীর টান অনুভব করা। নিজের দেশের প্রতি মানুষের এই গভীর ভালোবাসা বা টানকেই স্বদেশপ্রেম বলে। দেশের প্রতি খুব টান, গভীর ভালোবাসা এবং সঠিক সম্মান দেখানোই দেশপ্রেমের মূল কথা। পৃথিবীর অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি দেশপ্রেম নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো দেখলে তিনটি প্রধান বিষয়ের কথা জানা যায়। এগুলো হলো মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি। তাহলে বলা যায়, মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও টান মিলেই হয় স্বদেশপ্রেম। সহজ কথায়, নিজের দেশের ভালোর জন্য সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টাই হলো স্বদেশপ্রেম।


৩. স্বদেশপ্রেমের বিকাশ:
মা, মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমি হলো স্বদেশপ্রেম বেড়ে ওঠার তিনটি ধাপ। এই ধাপগুলো সফলভাবে পার হলেই একজন মানুষ পুরোপুরি দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠে।


৪. মায়ের মতো দেশ:
দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে, অনেক কষ্ট সহ্য করে যে মা আমাদের বড় করেছেন, সেই মায়ের সাথে আমাদের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক কখনো শেষ হওয়ার নয়। সন্তানের প্রতি মায়ের খাঁটি ভালোবাসা সন্তানকে ভালোবাসতে শেখায়। মায়ের এই ভালোবাসাই আমাদের মনে দেশপ্রেমের শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।


৫. দেশের মধুর মাতৃভাষা:
মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষাই হলো মাতৃভাষা। অর্থাৎ, যে ভাষায় মানুষ প্রথমবার মাকে 'মা' বলে ডাকে, সেটাই মাতৃভাষা। এই ভাষার সুন্দর কথার মাধ্যমে আমরা সবসময় আমাদের মনের কথা প্রকাশ করি। মাতৃভাষাকে ভালোবাসার মাধ্যমে, তাকে আমাদের মনের কথা বলার প্রধান মাধ্যম হিসেবে মনে ধারণ করার মাধ্যমেই মানুষের স্বদেশপ্রেম আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়।


৬. মাতৃভূমির স্নেহছায়া:
আমরা সবাই পৃথিবীর সন্তান, কিন্তু আমাদের সবার জন্মের একটি নির্দিষ্ট জায়গা আছে। পৃথিবীর যে নির্দিষ্ট জায়গায় আমরা জন্মাই, যে মাটির আলো-বাতাস, খাবার-জল খেয়ে আমরা বড় হই, সেটাই আমাদের জন্মভূমি বা মাতৃভূমি। জন্মভূমির আবহাওয়া, সমাজ, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদির সাথে পরিচিত হতে হতে আমাদের মনে জন্মভূমির এক প্রিয়, পবিত্র ও উজ্জ্বল ছবি তৈরি হয়। তখন আমরা আবেগে আপ্লুত হয়ে গেয়ে উঠি:
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে।”


৭. স্বদেশপ্রেমের আসল রূপ:
স্বদেশ মানে নিজের দেশ। নিজের দেশকে সবাই ভালোবাসে। মাকে যেমন সবাই কোনো স্বার্থ ছাড়া ভালোবাসে, তেমনি নিজের দেশের প্রতিও সবার ভালোবাসা সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই কথা, চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়ে নিজের দেশের প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ পায়। এই অনুভূতি মনের গভীর থেকে আসে। তাই এডউইন আর্নল্ড বলেছিলেন, ‘জীবনকে ভালোবাসি সত্যি, কিন্তু দেশের চেয়ে বেশি নয়।’ সংস্কৃত ভাষায় একটি শ্লোক আছে—"জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।" এর অর্থ হলো, মা এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।


৮. স্বদেশপ্রেমের অনুভূতি:
দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি অদম্য আকর্ষণ থেকেই স্বদেশপ্রেমের জন্ম হয়। পৃথিবীর সব জায়গার আকাশ, চাঁদ, সূর্য একই হলেও, দেশপ্রেমের কারণে মানুষ নিজের দেশের চাঁদ-সূর্য-আকাশকে আলাদাভাবে ভালোবেসে দেখে। স্বদেশপ্রেমের এই অনুভূতি সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় যখন দেশের স্বাধীনতা বিপদে পড়ে। তখন দেশপ্রেমের প্রবল আবেগে মানুষ নিজের জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। কারণ সে জানে, দেশের জন্য ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’


৯. ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেম:
আজকের ছাত্ররাই দেশের ও জাতির ভবিষ্যৎ। তারাই দেশের উন্নতি করবে এবং জাতির আশা পূরণ করবে। তাই দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছাত্রজীবনেই জাগিয়ে তুলতে হবে। দেশকে ভালোবাসার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। ছাত্রদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেই দেশের ভালোর জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করার ইচ্ছা তৈরি হবে। তাদের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবির কথা শোনা যাবে:
আমরা রচি ভালোবাসার আশার ভবিষ্যৎ,
মোদের স্বর্গ-পথের আভাস দেখায় আকাশ-ছায়াপথ।
মোদের চোখে বিশ্ববাসীর স্বপ্ন দেখা হোক সফল।
আমরা ছাত্রদল


১০. বাঙালির স্বদেশপ্রেম:
পৃথিবীতে যুগে যুগে অনেক দেশপ্রেমিক জন্মেছেন। তারা দেশের জন্য জীবন দিয়ে অমর হয়ে আছেন। বাংলাদেশেও এমন অনেক উদাহরণ আছে। অনেক আগে থেকেই এ দেশে বিদেশি শক্তি শাসন করার চেষ্টা করেছে, আর দেশপ্রেমিক বাঙালিরা দেশের স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষার জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শাসকরা যখন বাংলা ভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তখন রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকত-এর মতো অনেকে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন। এটা দেশপ্রেমের এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও দেশ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী, মা-বোনসহ সাধারণ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। এত সাহসী হাজার হাজার সৈনিকের দেশপ্রেমের উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। এখনও এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশের সামান্য ক্ষতির সম্ভাবনায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।


১১. স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম:
স্বদেশপ্রেম আসলে বিশ্বপ্রেমেরই একটি অংশ। কারণ পৃথিবীর সব মানুষই এই পৃথিবীতে বাস করে। তাই স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমে আমাদের সবারই বিশ্বের সব মানুষের প্রতি বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও একতা বাড়াতে হবে। কারণ আমাদের দেশ হলো সারা বিশ্বের একটি অংশ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই গেয়েছেন—
ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বময়ীর-তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা


১২. দেশপ্রেমের গুরুত্ব:
স্বদেশপ্রেম এমন একটি গুণ যা একজন মানুষকে নিজের সুখ, সুবিধা, আনন্দ এবং এমনকি দেশের জন্য তার জীবনও উৎসর্গ করতে উৎসাহিত করে। দেশপ্রেমের অদম্য ইচ্ছা মানুষকে দায়িত্বশীল, উদ্যোগী ও আগ্রহী করে তোলে। দেশপ্রেমিককে দেশের মানুষ খুব প্রশংসা করে ও সম্মান জানায়। অন্যদিকে ধর্মীয় দিক থেকেও স্বদেশপ্রেম খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা) বলেছেন—“হুববুল ওয়াতান মিনাল ঈমান”—অর্থাৎ “স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।” স্বদেশপ্রেমের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা জীবন দেন, তারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন।


১৩. দেশপ্রেমের নামে খারাপ কাজ:
স্বদেশপ্রেম সবসময়ই ভালো ও পবিত্র হওয়া উচিত। কিন্তু দেশপ্রেমের এই মহৎ আদর্শ ভুলে গিয়ে অনেকে দেশপ্রেমের নাম ব্যবহার করে সমাজে গোলমাল সৃষ্টি করে। অনেক নেতা শুধু নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একনায়ক হয়ে ওঠেন। এরা আসলে দেশপ্রেমিক নয়, বরং এরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদের কারণেই দেশ ও জাতির বিপদ হয়। ইতালির মুসোলিনী, জার্মানির হিটলার—এরা দেশপ্রেমের ইতিহাসে কালো অধ্যায় তৈরি করেছেন। এরা শুধু নিজের দেশের মানুষের চোখের জল ঝরাননি, সারা বিশ্বের মানুষেরও কষ্ট দিয়েছেন। তাই মানুষ তাদের কথা খুব ঘৃণাভরে স্মরণ করে।


১৪. অনুপ্রেরণার উৎস:
আমাদের দেশের গৌরবময় ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আমাদের দেশপ্রেমের এক অফুরন্ত উৎস। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, আর বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বীরত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আমাদের মনে দেশপ্রেমের বীজ বপন করে। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার—এগুলো শুধু প্রতীক নয়, এগুলো আমাদের গভীর দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি।


১৫. দেশের জন্য আমাদের দায়িত্ব:
প্রকৃত দেশপ্রেম শুধু মনে রাখলে হবে না, কাজেও দেখাতে হবে। দেশের ভালোর জন্য প্রত্যেক নাগরিকের কিছু দায়িত্ব আছে। যেমন—নিজের কাজ ঠিকমতো করা, দেশের আইন মেনে চলা, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, এবং খারাপ কাজ (যেমন দুর্নীতি) বন্ধ করার জন্য কথা বলা—এগুলোও দেশপ্রেমের অংশ। আমাদের ছোট ছোট এই কাজগুলোই একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে সাহায্য করে।


১৬. সংস্কৃতি ও দেশপ্রেম:
ভাষা, সাহিত্য, গান, নাচ, ছবি আঁকা—এগুলো সবই একটি জাতির সংস্কৃতির অংশ। এই সংস্কৃতিই একটি জাতিকে অন্য জাতি থেকে আলাদা করে তোলে। নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা, তাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সারা বিশ্বে তুলে ধরাও দেশপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মানুষ তার নিজের পরিচয় জানতে পারে এবং নিজেকে বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করে।


১৭. উপসংহার:
স্বদেশপ্রেম মানুষকে স্বার্থপরতা, ছোট চিন্তা এবং রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে তুলে একটি সুন্দর ও উন্নত দেশ গড়তে সাহায্য করে। দেশপ্রেম একটি স্বার্থহীন ভালোবাসা। কোনো লোভ বা পাওয়ার আশায় দেশকে ভালোবাসা যায় না। আসল দেশপ্রেমিকের কাছে দেশের ভালোই একমাত্র চাওয়া। দেশের জন্য তারা সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারেন। তাদের সাহস ও চারিত্রিক দৃঢ়তা সবসময় জাতিকে প্রেরণা জোগায়। তাই ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থকে সবার উপরে রাখতে হবে। দেশ গড়ার কাজে, দেশের জন্য ভালো কাজে আমাদের সবাইকে মনপ্রাণ দিয়ে অংশ নিতে হবে। সবার উপরে, দেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সমগ্র বিশ্বকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। তবেই আমাদের দেশপ্রেম সফল হবে এবং আমরা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়তে পারব।


পতিতপাবন মণ্ডল (পাবন) , বাংলা বিভাগীয় প্রধান, 
সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ

No comments

Thank you, best of luck

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.