বাংলা শেখার প্রয়োজনীয়তা
ভাষা মানুষের চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতির প্রধান বাহন। মাতৃভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা—যে ভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন-এ শহিদরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাই বাংলা শেখা শুধু শিক্ষাগত প্রয়োজন নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্বও।
প্রথমত, বাংলা শেখা ব্যক্তির মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা যায়, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থী বিষয়বস্তু দ্রুত ও গভীরভাবে বুঝতে পারে। যেমন—একজন শিক্ষার্থী যদি বিজ্ঞান বা ইতিহাস নিজের ভাষায় পড়ে, তবে সে সহজে ধারণা আয়ত্ত করতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটায়।
দ্বিতীয়ত, বাংলা আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাণ্ডার উন্মোচনের চাবিকাঠি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর রচনা মূল ভাষায় না পড়লে তার সৌন্দর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। অনুবাদে ভাবের অনেক সূক্ষ্মতা হারিয়ে যায়। বাংলা শেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গভীরভাবে জানতে পারি।
তৃতীয়ত, সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রেও বাংলার গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে প্রশাসন, আদালত, গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঠিকভাবে বাংলা লিখতে ও বলতে পারা একজন ব্যক্তির যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাংবাদিক বা শিক্ষক যদি প্রাঞ্জল ও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেন, তবে তার বক্তব্য অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী হয়।
চতুর্থত, বাংলা শেখা জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে। ভাষা আমাদের একসূত্রে বাঁধে। ভাষার মাধ্যমে আমরা সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করি। তাই বাংলা ভাষার চর্চা আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে তোলে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলা শেখা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। আধুনিক যুগে বিদেশি ভাষা শেখা প্রয়োজন হলেও মাতৃভাষার গুরুত্ব কখনো কমে না। তাই প্রত্যেকের উচিত শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল বাংলায় কথা বলা, লেখা ও চর্চা করা। বাংলা শেখার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের শিকড়কে দৃঢ় রাখি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে সক্ষম হই।

No comments
Thank you, best of luck