header ads

অনুচ্ছেদ ।। Class 9-10।। ১. জাদুঘর।। ২.সুন্দরবন।। ৩. কম্পিউটার ।। ৪. বিজয় দিবস ।। ৫. অতিথি পাখি ।।

১. জাদুঘর
জাদুঘর হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে কোনো দেশ ও জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়। এটি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে এবং মানুষকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করে। জাদুঘরের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘মিউজিয়াম’। প্রাচীন ও দুর্লভ বস্তু সংগ্রহের ধারণা থেকেই আধুনিক জাদুঘরের উদ্ভব হয়েছে। একটি জাদুঘরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পুরোনো মুদ্রা, শিলালিপি, পাণ্ডুলিপি, অস্ত্রশস্ত্র, পোশাক, তৈজসপত্র, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, জীবাশ্ম এবং ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষিত থাকতে পারে। এসব উপকরণ দেখে দর্শনার্থীরা কোনো দেশ বা সভ্যতার অতীত জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, রুচি ও জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করে। তাই জাদুঘরকে একটি জাতির স্মৃতিভান্ডার বলা হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের জাদুঘর রয়েছে। ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দেশের বৃহত্তম জাদুঘর। এখানে বাংলাদেশের ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের বহু মূল্যবান নিদর্শন প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত শহীদদের ব্যক্তিগত সামগ্রী, চিঠি, আলোকচিত্র ও সংবাদপত্র আমাদের স্বাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর বাংলার গ্রামীণ জীবন, তাঁতশিল্প, মৃৎশিল্প এবং লোকজ ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। জাদুঘর কেবল পুরোনো বস্তু প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি শিক্ষা ও গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা বইয়ে পড়া ইতিহাসের বাস্তব নিদর্শন দেখে জ্ঞানকে আরও স্পষ্ট ও স্থায়ী করতে পারে। গবেষকেরা সংরক্ষিত দলিল ও প্রত্নবস্তুর সাহায্যে অতীতের অজানা তথ্য আবিষ্কার করেন। আধুনিক জাদুঘরে ডিজিটাল প্রদর্শনী, ত্রিমাত্রিক মডেল, তথ্যচিত্র এবং শব্দ-আলোর ব্যবহার দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তবে অযত্ন, পরিবেশদূষণ, আর্দ্রতা, অগ্নিকাণ্ড ও চুরির কারণে মূল্যবান নিদর্শন নষ্ট হতে পারে। তাই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলো সংরক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত পরিচর্যা করা প্রয়োজন। জাদুঘরের নীরব কক্ষে ইতিহাস যেন নির্বাক হয়েও কথা বলে। সেখানে সংরক্ষিত প্রতিটি নিদর্শন আমাদের পূর্বপুরুষের জীবন, সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীলতার সাক্ষ্য বহন করে। নতুন প্রজন্ম নিয়মিত জাদুঘর পরিদর্শন করলে দেশপ্রেম ও ঐতিহ্যবোধে সমৃদ্ধ হবে। অতএব, জাতির আত্মপরিচয় রক্ষা এবং অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জাদুঘরের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ অপরিহার্য।

২. সুন্দরবন
সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন এবং বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীব্যবস্থার বদ্বীপ অঞ্চলে এর অবস্থান। অপরূপ সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে বনটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সুন্দরবনের মোট আয়তনের বড় অংশ বাংলাদেশে এবং অবশিষ্ট অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এর বিস্তার। অসংখ্য নদী, খাল, চর ও ছোট দ্বীপ এই বনকে বৈচিত্র্যময় রূপ দিয়েছে। সুন্দরীগাছের প্রাচুর্য থেকে ‘সুন্দরবন’ নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। এখানে সুন্দরী ছাড়াও গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুর, বাইন ও গোলপাতাসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে। লবণাক্ত মাটি ও জোয়ার-ভাটার পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এসব গাছের শ্বাসমূল ও বিশেষ ধরনের শিকড় দেখা যায়। সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এ ছাড়া এখানে চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য শূকর, কুমির, গুইসাপ, অজগর, ডলফিন এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি ও মাছ রয়েছে। মৌয়ালরা বন থেকে মধু ও মোম সংগ্রহ করেন। বাওয়ালি ও জেলেরা যথাক্রমে গোলপাতা, কাঠ এবং মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে জীবিকার সন্ধানে বনে প্রবেশ করা মানুষের জীবন সব সময় নিরাপদ নয়; বাঘ, কুমির, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি তাদের মোকাবিলা করতে হয়। সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে বনটি লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে। এটি বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস করতেও সাহায্য করে। জীববৈচিত্র্যের অসামান্য গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত লবণাক্ততা, নদীদূষণ, অবৈধ শিকার এবং নির্বিচার সম্পদ আহরণ সুন্দরবনের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। শিল্পবর্জ্য ও নৌযান দুর্ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া তেলও বনের জলজ পরিবেশের ক্ষতি করে। সুন্দরবন রক্ষায় বন আইন প্রয়োগ, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। সুন্দরবন কেবল গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল নয়; এটি বাংলাদেশের প্রকৃতির সবুজ প্রহরী। এই বন ধ্বংস হলে জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় জনপদ ও দেশের পরিবেশ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। তাই ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবন বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে এবং নিরাপদ থাকবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।

৩. কম্পিউটার

কম্পিউটার হলো নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং ফলাফল প্রদর্শনকারী একটি আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্র। মানুষের জটিল হিসাব ও বহুমুখী কাজ সহজ করার মাধ্যমে এটি বর্তমান সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা এবং যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।  ‘কম্পিউটার’ শব্দটি ইংরেজি ‘কম্পিউট’ থেকে এসেছে, যার অর্থ হিসাব করা। তবে আধুনিক কম্পিউটারের কাজ কেবল হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি লেখা, ছবি আঁকা, গান শোনা, ভিডিও দেখা, তথ্য অনুসন্ধান, নকশা তৈরি, রোগ নির্ণয় এবং গবেষণাসহ অসংখ্য কাজে ব্যবহৃত হয়। কম্পিউটারের প্রধান দুটি অংশ হলো হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। মনিটর, কিবোর্ড, মাউস, প্রসেসর ও স্মৃতিযন্ত্র হার্ডওয়্যারের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে কম্পিউটার পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত প্রোগ্রাম ও নির্দেশনাগুলোকে সফটওয়্যার বলা হয়। চার্লস ব্যাবেজকে আধুনিক কম্পিউটারের জনক বলা হয়। তাঁর পরিকল্পিত ‘অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’ পরবর্তী কম্পিউটার প্রযুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। সময়ের সঙ্গে কম্পিউটারের আকার ছোট হলেও এর গতি, স্মৃতিশক্তি ও কার্যক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। বর্তমানে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও স্মার্টফোনের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, মাল্টিমিডিয়া পাঠ এবং গবেষণায় কম্পিউটারের ব্যবহার অপরিহার্য। চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগীর তথ্য সংরক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার ও নতুন ওষুধ আবিষ্কারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংক, ব্যবসা, কৃষি, প্রকৌশল, মহাকাশ গবেষণা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কম্পিউটার পৃথিবীকে একটি বিশ্বগ্রামে পরিণত করেছে। মুহূর্তের মধ্যে দূরদেশে বার্তা পাঠানো, ভিডিও কলে কথা বলা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও তথ্যবিশ্লেষণ কম্পিউটারের সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে এর অপব্যবহারে সাইবার অপরাধ, তথ্য চুরি, ভুয়া সংবাদ, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আসক্তি সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহারে চোখ ও শরীরেরও ক্ষতি হয়। তাই শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত বিরতি গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং নৈতিকতার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। কম্পিউটার মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি মানুষের মেধা ও কর্মক্ষমতার বিশ্বস্ত সহায়ক। এর সুফল গ্রহণের পাশাপাশি অপব্যবহার ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই কম্পিউটার জ্ঞানভিত্তিক, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণে সত্যিকার আশীর্বাদ হয়ে উঠবে এবং মানুষের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করবে।

৪. বিজয় দিবস
বিজয় দিবস বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় গৌরবের এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে এবং বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ অঞ্চলের মানুষের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য চাপিয়ে দেয়। বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে দমনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তি গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে। নির্বাচনে জয়লাভ করেও আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এরপর স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন এবং নির্যাতনের শিকার হন। মুক্তিবাহিনীকে এগারোটি সেক্টরে সংগঠিত করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয় বলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বয়ানে উল্লেখ করা হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। যুদ্ধের শেষ দিকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী সরাসরি অংশ নিলে যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। প্রতি বছর জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, কুচকাওয়াজ, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়। বিজয় দিবস কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, সাহস এবং দেশপ্রেমের মহিমান্বিত স্মারক। শহিদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে হবে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই বিজয়ের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশকে ভালোবাসা এবং দুর্নীতিমুক্ত ও উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

৫. অতিথি পাখি
অতিথি পাখি হলো সেই সব পরিযায়ী পাখি, যারা শীত, খাদ্যসংকট কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে রক্ষা পেতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে আসে। শীতকালে দূরদেশ থেকে আগত এসব পাখি বাংলাদেশের প্রকৃতিতে সৌন্দর্য ও প্রাণচাঞ্চল্য যোগ করে। পৃথিবীর উত্তরাঞ্চলের দেশগুলোতে শীতকালে তাপমাত্রা অত্যন্ত কমে যায় এবং নদী-হ্রদের পানি বরফে পরিণত হয়। ফলে পাখিদের খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। জীবন রক্ষার তাগিদে তারা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তুলনামূলক উষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। বাংলাদেশে সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অতিথি পাখির বিচরণ দেখা যায়। সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন, নেপাল, হিমালয় অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে বহু প্রজাতির পাখি এখানে আসে। বাংলাদেশের হাওর, বাঁওড়, বিল, নদী, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় জলাভূমি তাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের উপযোগী পরিবেশ দেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল, নিঝুম দ্বীপ এবং সুন্দরবনে অতিথি পাখির সমাগম বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। সরালি, বালি হাঁস, খুনতে হাঁস, পাতারি হাঁস, গিরিয়া হাঁস, ল্যাঞ্জা হাঁস, পিয়াং হাঁস এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাঙচিল ও জলচর পাখি আমাদের পরিচিত অতিথি। পরিযানের সময় পাখিরা সূর্য, নক্ষত্র, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র, নদীপথ ও ভূপ্রকৃতিকে দিকনির্ণয়ের সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। অতিথি পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষির উপকার করে, বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বিস্তার ঘটায় এবং জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখে। কোনো অঞ্চলে পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি সেই অঞ্চলের পরিবেশগত সুস্থতারও পরিচায়ক। কিন্তু জলাভূমি ভরাট, দূষণ, বৃক্ষনিধন, উচ্চ শব্দ, কীটনাশকের ব্যবহার এবং অবৈধ শিকারের কারণে এসব পাখির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। অনেকে আনন্দ বা অর্থের লোভে পাখি শিকার ও বিক্রি করে, যা আইনত দণ্ডনীয় এবং নৈতিকভাবে নিন্দনীয়। অতিথি পাখি রক্ষায় অভয়ারণ্য সংরক্ষণ, শিকারবিরোধী আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। দিগন্ত পেরিয়ে আসা অতিথি পাখিরা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সম্পদ নয়; তারা মুক্ত আকাশ ও বিশ্বপ্রকৃতির সন্তান। তাদের কলকাকলিতে বাংলাদেশের শীতকাল হয়ে ওঠে আনন্দময় ও বর্ণিল। জলাভূমি রক্ষা, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। পাখিদের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যৎকেই রক্ষা করি।



No comments

Thank you, best of luck

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.