বাংলা দ্বতীয় পত্র।। অষ্টম শ্রেণি; নবম-দশম; একাদশ-দ্বাদশ।। দুর্নীতি জাতির সকল উন্নতির অন্তরায়।।
দুর্নীতি এমন এক মরণব্যাধি, যা একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় এবং জাতীয় উন্নয়নের চাকা স্তব্ধ করে দেয়। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অবৈধ বা অসৎ উপায় অবলম্বন করাই দুর্নীতি। এটি শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করে না; সমাজ, সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেও ধ্বংস করে। যে সমাজে দুর্নীতি স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে, সে সমাজ কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
একটি জাতির উন্নতির প্রধান পূর্বশর্ত হলো সুশাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। কিন্তু দুর্নীতি এই ভিত্তিগুলোকেই দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য, অর্থপাচার, কর ফাঁকি ও ক্ষমতার অপব্যবহার ছড়িয়ে পড়লে যোগ্যরা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অযোগ্যরা সমাজের চালকের আসনে বসে। ফলে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়, কাজের মান কমে এবং সরকারি সম্পদের অপচয় হয়। একটি সেতু, সড়ক বা হাসপাতাল নির্মাণে দুর্নীতি হলে তা শুধু অর্থের ক্ষতি নয়; নিম্নমানের অবকাঠামোর কারণে মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে। দুর্নীতি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ায় এবং সাধারণ মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিচার পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত করে। এতে জনগণ রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি আস্থা হারায়; সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অপরাধপ্রবণতা ও হতাশা বৃদ্ধি পায়। দুর্নীতিবাজরা দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে, অর্থনীতি রক্তশূন্য হয়ে পড়ে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়ে। দুর্নীতি উইপোকার মতো বাইরে থেকে রাষ্ট্রের কাঠামো অটুট মনে হলেও ভেতরটা ধীরে ধীরে অসার করে দেয়। তাই সাময়িক ব্যক্তিগত লাভ শেষ পর্যন্ত সমগ্র জাতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপে পরিণত হয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, জাপান ও ফিনল্যান্ডের অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হলো সততা, আইনের শাসন এবং কার্যকর ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান। পক্ষান্তরে, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও অনেক দেশ ব্যাপক দুর্নীতির কারণে আজও দরিদ্র ও পশ্চাৎপদ। সুতরাং সম্পদের প্রাচুর্যের চেয়ে তার সৎ, দক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনা বেশি জরুরি।
দুর্নীতি দমনে কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা, সরকারি ব্যয়ের উন্মুক্ত হিসাব, ডিজিটাল সেবা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিবাজের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সততা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে হবে। নাগরিকদেরও ঘুষ না দেওয়া, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং দুর্নীতির তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। জনসচেতনতা গড়ে তুলতে বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। নির্বাচনে সৎ প্রতিনিধি বেছে নেওয়া ও সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের বর্জন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থে জরুরি।
অতএব, দুর্নীতি কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি জাতীয় অগ্রগতির প্রধান শত্রু। রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স নীতি এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে সততার চর্চাই পারে জাতিকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করে টেকসই উন্নয়ন, মর্যাদা ও সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দিতে।
No comments
Thank you, best of luck