নিদারাবাদের বাতাসে এখনো ভাসে যে করুণ আর্তনাদ: এক অমানবিক আখ্যান
সময়টা ১৯৮৯ সাল। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামের শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ তখনো এক ভয়াল ঝড়ের পূর্বাভাস পায়নি। গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী এক সহজ-সরল পরিবার, শশাঙ্ক দেবনাথের ঘর। যে ঘরে একদিন সানাইয়ের সুর বাজত, ছিল পাঁচ সন্তানের কলকাকলি, সেই ঘরটি আজ কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেও, তার পেছনের যে রক্তস্নাত ইতিহাস, তা আজও মানুষের হাড় হিম করে দেয়। এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং লোভ ও ক্ষমতার কাছে মানবতার নির্লজ্জ পরাজয়ের দলিল।
অধ্যায় ১: শশাঙ্কের রহস্যময় অন্তর্ধান (১৯৮৭)
উপন্যাসিক যেমন কোনো ট্র্যাজেডির সূচনা করেন ধীর লয়ে, তেমনই এই ঘটনার প্রথম অঙ্ক শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। হঠাৎ করেই একদিন নিদারাবাদ গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যান শশাঙ্ক দেবনাথ। কেউ জানে না, সে কোথায় গেল? কেন গেল? কখনেই বা গেল? পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী—সবার কাছেই শশাঙ্কের অন্তর্ধান এক বিরাট ধাঁধা। তিনি কোনো চিরকুট রেখে যাননি, কোনো সংকেত দেননি।
গ্রামে রটনা আর আলোচনার ঝড় উঠল। গ্রাম্য সমাজ, যা প্রায়শই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করে, তারা এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। অধিকাংশের ধারণা হলো, শশাঙ্ক নিশ্চয়ই আগেই ভারতে পাড়ি জমিয়েছিল, আর এখন সুযোগ বুঝে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এই সহজ সমীকরণ গ্রামবাসীর কাছে গ্রহণীয় ছিল কারণ তাতে সমাজের গভীর কোনো ক্ষত দেখতে পেত না।
কিন্তু এই অন্তর্ধানের আড়ালে যে এক গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, তা তখনো কারো কল্পনায় আসেনি। শশাঙ্ক আসলে স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাননি, তাঁকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল চিরতরে।
অধ্যায় ২: শয়তানের প্রলোভন ও প্রস্তুতি
শশাঙ্কের নিখোঁজ হওয়ার পর তার সামান্য ভিটেমাটি ও জমিজমার ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে পাশের গ্রামের কসাই মো. তাজুল ইসলামের। শশাঙ্কের জমি দখলে নিতে তাজুল এক অশুভ পরিকল্পনা আঁটে। নিছক সম্পত্তি লোভ তাকে নরপিশাচে রূপান্তর করে। তাজুল ভালো করেই জানত, শশাঙ্ক বেঁচে থাকতে তার এই সম্পত্তি দখলের কোনো সুযোগ নেই। তাই শশাঙ্ককে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল তার একমাত্র পথ।
পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ দিতে তাজুল তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে বেছে নেয় আবদুল হোসেন ও বাগদিউয়ার হাবিবকে। হত্যার ৫-৬ দিন আগে পাঁচগাও বাজারের একটি কাঠের দোকানের পেছনে তাজুল তাদের কাছে তার অভিসন্ধি ব্যক্ত করে। শশাঙ্কের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নির্মূল করার ছক কষা হয়।
এই জঘন্য কাজের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হয়। অর্থের বিনিময়ে জীবন কেড়ে নেওয়ার এই ব্যবসায় আবদুল হোসেন ৩০ হাজার টাকা দাবি করে, যদিও পরে তাজুল তা ২০ হাজার টাকায় রফা করে। টাকার জোগান দিতেও তাজুল কোনো কসুর করেনি। সে তার অন্য সহযোগীদের মাধ্যমে বাগদা গ্রামের মোমিনের কাছে ১৫ হাজার টাকা অগ্রিম জমা রাখে এবং ঘটনার চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঠিক করে ৩রা সেপ্টেম্বর।
অধ্যায় ৩: কালরাত্রি এবং ছয়টি জীবনের অবসান (১৯৮৭ - শশাঙ্কের হত্যা)
তাজুল ইসলামের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের শিহরণ জাগানো বিবরণ। ১৯৮৭ সালের এক শুক্রবার, সকাল সাড়ে পাঁচটা। তাজুল ও তার জামাতা ইনু মিয়া শশাঙ্কের বাড়িতে উপস্থিত হয়। শশাঙ্কের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে বোঝানো হয় যে, তার মেয়ের জামাই মনা দেবনাথ ভারত সীমান্তে তার জন্য অপেক্ষা করছে। শশাঙ্ক কোনো সংশয় না করে তাদের সাথে বের হয়ে পড়ে।
তারা শশাঙ্ককে নিয়ে মাধবপুরের নিজনগর গ্রামে মো. আজিদের বাড়িতে যায়। সেখানে তাকে একটি ঘরে বসিয়ে রেখে অপেক্ষা করা হয়। রাত ১২টার সময়, যখন পৃথিবী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই শশাঙ্কের গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পাপের এই যাত্রায় তাজুল, ইনু ও আজিদ ছাড়াও আরও দুজন অপরিচিত ব্যক্তি অংশ নিয়েছিল। হত্যার পর শশাঙ্কের মৃতদেহ কাঁধে করে ভারতের চেহরিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি পরিত্যক্ত রিফিউজি ক্যাম্পের পাত কুয়ায় নিক্ষেপ করে নিশ্চিত করা হয় যে, শশাঙ্ক যেন আর কোনোদিন ফিরে না আসে।
অধ্যায় ৪: প্রথম অঙ্কের সমাপ্তি ও অশুভ শক্তির জয়
শশাঙ্কের অন্তর্ধানের পর গ্রামের মানুষ ধরেই নিয়েছিল সে ভারতে চলে গেছে। তাজুল ইসলাম তখনো তার মতলব পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সে প্রচার করতে শুরু করে যে শশাঙ্ক তার কাছে জমি বিক্রি করে গেছে। গ্রামবাসীকে সে বলে, যেহেতু শশাঙ্ক জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেয়নি, তাই এই জমি এখন তারই। এই নিয়ে গ্রামের মাতব্বরদের সামনে কিছুটা ঝগড়াঝাটি হলেও, সময়ের স্রোতে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
গ্রামের মানুষ শশাঙ্কের চরিত্র হনন করতেও পিছপা হয়নি। তাকে গালি দিয়ে বলা হতো, 'মালোউনের বাচ্চা, এক জমি তিনজনের কাছে বিক্রি করে আ-কাডাগো দেশে পালাইছে। বেঈমান, মালাউন।' এই গালির আড়ালে শশাঙ্কের পরিবার যে চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছিল, তা কেউ বুঝতে পারেনি।
অধ্যায় ৫: বিরজাবালা ও তার সন্তানদের অন্তর্ধান (১৯৮৯)
শশাঙ্কের অন্তর্ধানের প্রায় দুই বছর পর, ১৯৮৯ সালের এক রাতে নিদারাবাদ গ্রামে আবার এক দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। শশাঙ্কের পরিবার, অর্থাৎ তার স্ত্রী বিরজাবালা এবং তাদের পাঁচ সন্তান—নিয়তি, ছোট ছেলে, ছোট মেয়ে এবং আরও দুটি ছেলে—সবাই একরাতের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। কারো কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
গ্রামের মানুষের কাছে এই ঘটনাও প্রথম ঘটনারই একটি সম্প্রসারিত রূপ বলে মনে হয়। তারা ধরে নেয়, শশাঙ্ক আগেই চলে গিয়েছিল, এখন সুযোগ বুঝে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরও নিয়ে গেছে। এখানেই এই ট্র্যাজেডির প্রথম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। সমাজ মনে করে, একটি পরিবার 'সুখে' ভারতে পাড়ি দিয়েছে। তাদের ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন নেমে এসেছে, তা তাদের অগোচরেই থেকে যায়।
অধ্যায় ৬: নরপিশাচের প্রস্তুতি এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা
শশাঙ্কের সম্পত্তি পুরোপুরি নিজের কবজায় নিতে তাজুল ইসলাম বুঝতে পারে, বিরজাবালা ও তার সন্তানদেরও চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে তারা ফিরে এসে সম্পত্তির দাবি জানাতে পারে। তাই তাজুল একটি বৈঠক ডাকে, যেখানে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হয়।
সে ৫ই সেপ্টেম্বর রাতটিকে বেছে নেয় এই জঘন্য কাজের জন্য। মোমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুটি ড্রাম, লবণ এবং দুই মণ চুন আগেই কিনে রাখে। এই সরঞ্জামগুলো ইঞ্জিনের নৌকায় তোলা হয়। তাজুল এখতারপুরের সহিদ মাঝির ইঞ্জিন চালিত নৌকা ২০০ টাকায় ভাড়া করে। ৫ই সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার সময় মোমিন, হাবিব, ইদ্রিস আলী, আলী আজম, আলী আহমেদ, শামসু, বাদশা, সুতা মিয়া, বেলু, ফিরোজ, আবদুল হোসেন, সৈয়দ মিয়া, জজ মিয়া, আবু সায়েদ, কাসেম, তাজন, হরিপুরের ফিরোজ, সহিদ, মোমানু মেম্বার এবং আরও ৮/১০ জন পরিচিত ব্যক্তি নৌকাযোগে বা পায়ে হেঁটে তাজুলের বাড়িতে এসে জড়ো হয়।
অধ্যায় ৭: কালরাত্রি (১৯৮৯ - বিরজাবালা ও সন্তানদের হত্যা)
রাত আনুমানিক ১২টা। দুটি নৌকাযোগে ঘাতকরা শশাঙ্কের বাড়ির দিকে রওনা হয়। নৌকা দুটি শশাঙ্কের বাড়ির পাশে ভিড়ে। দুজন পাহারায় থাকে এবং বাকিরা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। তাজুল ফাল দিয়ে বিরজাবালার ঘরের পেছনের জানালার রড বাঁকা করে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ঘরের সামনের দরজা খুলে দেয়।
তাজুল ও আবদুল হোসেন বিরজাবালার মুখ চেপে ধরে। বিরজাবালার বড় মেয়ে নিয়তি সামান্য চিৎকার দিয়ে ওঠে। ঘাতকরা বিরজাবালার ৫ ছেলে মেয়েকে মুখ চেপে কোলে করে নৌকায় উঠায়। নৌকায় উঠানোর পর আবদুল হোসেন বিরজাবালা ও তার সন্তানদের শাসিয়ে বলে, শব্দ করলে তাদের সবাইকে কেটে ফেলা হবে। তারপর ইঞ্জিন নৌকাটি ধোপাজুরি বিলে নিয়ে যাওয়া হয়। ইঞ্জিন বিহীন নৌকাটি ইঞ্জিনের নৌকার পেছনে ছিল। বিলে নৌকা থামিয়ে তাজুল ও ফিরোজ বিরজাবালাকে চেপে ধরে। তাজুল তার হাতে থাকা রামদা দিয়ে বিরজাবালার নাভী বরাবর দুই-তিন কোপ দিয়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে। এরপর আলী আজম ও ফিরোজ বিরজাবালার বড় মেয়ে নিয়তিকে চেপে ধরে। আবদুল হোসেন রামদা দিয়ে দুই কোপে মেয়েটিকে দ্বিখণ্ডিত করে। ধনু মিয়া বিরজার ছোট ছেলেকে গলা টিপে মেরে ফেলে। ফিরোজ আলী বিরজার ছোট মেয়েকে চেপে ধরলে আলী আজম দা দিয়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে। বাদশা এবং হাবিব বিরজা ও শশাঙ্কের ছোট দুটি ছেলেকে কুপিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে। বিরজাকে যখন হত্যা করা হচ্ছিল, তখন তার পরনে কোনো কাপড় ছিল না।
ঘাতকরা এরপর খণ্ডিত দেহগুলো দুটি খালি ড্রামে ভরে। তাতে লবণ ও চুন মিশিয়ে ড্রামের ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর ড্রামগুলো পানিতে ডুবিয়ে রশি দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়। পাপের সাক্ষী বহনকারী রক্তরঞ্জিত নৌকাটি ধুয়ে মুছে ফেলা হয়। তাজুল ও আবদুল হোসেন সবাইকে সতর্ক করে দেয় যে, কেউ মুখ খুললে তাদের পরিণতিও বিরজাবালার মতোই হবে।
পরদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়ে তাজুল তার চাচাতো ভাই মতিউর রহমানকে ৯ শতক নিজের জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়। এটি ছিল এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের একটি বড় প্রমাণ।
অধ্যায় ৮: বিভীষিকার উন্মোচন
ঘটনার কিছুদিন পর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক বিকেলে নৌকা যোগে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধুপাজুড়ি বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। তিনি মাঝিকে নৌকাটা খানিক ঘুরিয়ে নিতে বলেন। হঠাৎ নৌকার নিচে কী একটা আটকে যাওয়ায় নৌকাটি দুলে ওঠে এবং মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দ হয়। আবুল মোবারকের সন্দেহ হয়। মাঝি তখন বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচাখুঁচি করতেই একটি ড্রাম উঠে আসে।
ড্রামটির মুখ আটকানো ছিল এবং চারদিকে ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আবুল মোবারক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দেন। ড্রাম খুলতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে যায় ভেতরে তিনটি লাশ।
সংশয় ও আতঙ্ক আরও বাড়ে। আরও তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে বিলে আরেকটি ড্রাম পাওয়া যায়, যেটিতে আরও তিনজনের লাশ টুকরো টুকরো করে রাখা ছিল। মোট ছয়টি লাশ। এরা আর কেউ নয়, নিদারাবাদ গ্রামের নিরীহ শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান—বিরজাবালা, নিয়তি ও তাদের ছোট ভাই-বোনেরা। তাদের সর্বকনিষ্ঠ নিহত সন্তানের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। শশাঙ্কের এক মেয়ে সুনীতিবালা শ্বশুরবাড়িতে থাকায় সে প্রাণে বেঁচে যায়।
অধ্যায় ৯: গণআন্দোলন, বিচার ও প্রায়শ্চিত্ত
এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশ ফুঁসে ওঠে। মানুষ যে কতটা পাশবিক, নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা এই জঘন্য ঘটনাটি প্রমাণ করে। জনরোষের মুখে প্রশাসন তৎপর হয় এবং পুলিশ তদন্তে নামে। পুলিশি তদন্তে এই সত্য উদঘাটিত হয় যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শশাঙ্কের জমি দখল করতে প্রথমে শশাঙ্ককে হত্যা করে লাশ গুম করা হয় এবং পরে এক রাতে পুরো পরিবারকেই নৌকায় তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ড্রামে ভরে বিলে পুঁতে ফেলা হয়। দিনে তারা প্রচার করেছিল বিরজাবালার পরিবার ভারতে চলে গেছে।
তদন্তে স্পষ্ট হয় যে শশাঙ্কের সম্পত্তির ওপর লোভ ছিল পাশের গ্রামের কসাই মো. তাজুল ইসলামের। এ কারণেই সে প্রথমে অপহরণ করে শশাঙ্ককে হত্যা করে এবং দুই বছর পর তার স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে লাশ ভরে বিলে ফেলে দেয়।
বিচারের রায়ে মো. তাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। খুনি কসাই মো. তাজুলের প্রতি মানুষের ঘৃণা এতটাই প্রবল ছিল যে, তার ফাঁসি কার্যকর করার পর ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। মো. তাজুলের লাশ যখন কারাগার থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন ক্ষুব্ধ মানুষ তার লাশের ওপর থুথু ছিটিয়েছিল এবং জুতো ছুড়ে মেরেছিল। এটি ছিল তার জঘন্য পাপের প্রতীকী প্রায়শ্চিত্ত।
প্রায় ৩৮ বছর পার হয়ে গেছে এই ঘটনার। কিন্তু নিদারাবাদ গ্রামের বাতাস আজও যেন সেই করুণ আর্তনাদ বহন করে চলে। ছয়টি নিরপরাধ মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ড—একজন স্বামী ও বাবা, একজন মা, এবং পাঁচটি নিষ্পাপ শিশু—যাদের জীবন কেবল লোভের কারণে অকালে ঝরে গিয়েছিল। এই ঘটনা মনে করলে আজও সেখানকার মানুষ আঁতকে ওঠেন।
এই আলোচিত ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তীতে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, যার নাম ছিল ‘কাঁদে নিদারাবাদ’। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি স্মারক, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে লোভ কীভাবে মানুষকে পশুতে রূপান্তর করতে পারে এবং কীভাবে নির্লজ্জ অমানবিকতার বিরুদ্ধে সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ একদিন সত্যকে উন্মোচন করে। শশাঙ্ক দেবনাথ ও তার পরিবারের ট্র্যাজেডি বাংলার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়, যা মানবতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
পতিতপাবন মণ্ডল (পাবন)
No comments
Thank you, best of luck