সিটি ব্যাংকের TTM P/E ৩.১৫: আয়ের তুলনায় শেয়ারমূল্য কতটা আকর্ষণীয়?
নিজস্ব প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দ্য সিটি ব্যাংক পিএলসির শেয়ারদর ও সর্বশেষ আয়সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানটির তিন ধরনের মূল্য-আয় অনুপাত বা P/E ratio দেখা যাচ্ছে। প্রদত্ত বাজারতথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির Trailing Twelve Months বা TTM P/E ৩.১৫, Unaudited P/E ৫.২০ এবং Audited P/E প্রায় ৩.৬০। একই প্রতিষ্ঠানের তিনটি P/E আলাদা হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে মূলত ভিন্ন সময়ের এবং ভিন্ন ধরনের EPS ব্যবহারের কারণেই এই পার্থক্য দেখা যায়।
তথ্যচিত্রে সিটি ব্যাংকের সর্বশেষ শেয়ারদর দেখানো হয়েছে ৩১ টাকা ১০ পয়সা। একই সঙ্গে সর্বশেষ ১২ মাসের শেয়ারপ্রতি আয় বা EPS দেখানো হয়েছে ৯ টাকা ৮৬ পয়সা। P/E নির্ণয়ের সাধারণ সূত্র হচ্ছে—বর্তমান বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি আয় দিয়ে ভাগ করা। সে হিসাবে ৩১.১০ টাকা শেয়ারদরকে ৯.৮৬ টাকা TTM EPS দিয়ে ভাগ করলে P/E দাঁড়ায় প্রায় ৩.১৫।
অর্থাৎ সিটি ব্যাংক সর্বশেষ ১২ মাসে প্রতি শেয়ারে এক টাকা আয় করার বিপরীতে বাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৩ টাকা ১৫ পয়সা মূল্য দিচ্ছেন। সহজ ভাষায়, ব্যাংকটির সাম্প্রতিক ১২ মাসের আয়ের প্রায় ৩.১৫ গুণ দামে শেয়ারটি লেনদেন হচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সময় হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। কারণ ভবিষ্যতে ব্যাংকের আয়, শেয়ারদর, লভ্যাংশ ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
TTM P/E কীভাবে নির্ধারিত হয়
Trailing Twelve Months বলতে কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ টানা ১২ মাসের আর্থিক ফলাফল বোঝায়। এটি সব সময় জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরকে নির্দেশ করে না। সাধারণত সর্বশেষ প্রকাশিত চারটি প্রান্তিকের EPS যোগ করে TTM EPS বের করা হয়। এ কারণে পুরোনো অডিটেড হিসাবের তুলনায় TTM তথ্য প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক পরিচালনাগত অবস্থার একটি তুলনামূলক হালনাগাদ চিত্র দেয়।
সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে TTM EPS ৯.৮৬ টাকা। শেয়ারটির বাজারদর ৩১.১০ টাকা ধরে হিসাবটি হচ্ছে—
TTM P/E = ৩১.১০ ÷ ৯.৮৬ = ৩.১৫।
ব্যাংকটির TTM P/E তিনটি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর প্রধান কারণ হচ্ছে TTM হিসাবে ব্যবহৃত EPS অন্য হিসাবগুলোর EPS-এর তুলনায় বেশি। EPS বাড়লে শেয়ারদর অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় P/E কমে যায়। বিপরীতে, EPS কমে গেলে একই বাজারদরে P/E বেড়ে যায়।
Unaudited P/E কেন ৫.২০
প্রদত্ত তথ্যে সিটি ব্যাংকের Unaudited P/E দেখানো হয়েছে ৫.২০। Unaudited বা অনিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল বলতে সাধারণত ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক অথবা নয় মাসের হিসাবকে বোঝায়, যা পূর্ণ বছরের চূড়ান্ত অডিটেড প্রতিবেদন নয়। এই ধরনের আয়কে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বার্ষিকীকরণ করে সংশ্লিষ্ট P/E প্রদর্শন করা হতে পারে।
৩১.১০ টাকা বাজারদর এবং ৫.২০ P/E ধরে হিসাব করলে ব্যবহৃত বার্ষিকীকৃত EPS দাঁড়ায় আনুমানিক ৫.৯৮ টাকা। অর্থাৎ—
আনুমানিক Unaudited EPS = ৩১.১০ ÷ ৫.২০ = ৫.৯৮ টাকা।
এরপর,
Unaudited P/E = ৩১.১০ ÷ ৫.৯৮ = প্রায় ৫.২০।
ধরা যাক, কোনো ব্যাংক প্রথম ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি ২.৯৯ টাকা আয় করেছে। এ আয়কে সাধারণভাবে বার্ষিকীকরণ করলে সম্ভাব্য EPS দাঁড়ায় ৫.৯৮ টাকা। তবে এটি কেবল হিসাব বোঝানোর উদাহরণ। সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম কোন প্রতিবেদন, মূল্য বা বার্ষিকীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, তা না জানলে ৫.২০ P/E-এর সুনির্দিষ্ট ভিত্তি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
Unaudited ফলাফল তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক হলেও এটি পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ থাকে। বছর শেষে অডিটের সময় আয়, ব্যয়, কর, ঋণক্ষতির বিপরীতে প্রভিশন এবং অন্যান্য হিসাব সমন্বয় করা হলে চূড়ান্ত EPS বাড়তে বা কমতে পারে। এ কারণে শুধু Unaudited P/E দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
Audited P/E প্রায় ৩.৬০
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য সিটি ব্যাংকের অডিটেড বার্ষিক EPS ছিল ৮.৭১ টাকা। বর্তমান বাজারদর ৩১.১০ টাকা দিয়ে এই EPS ভাগ করলে P/E দাঁড়ায় প্রায় ৩.৫৭, যা এক দশমিক ঘরে প্রকাশ করলে ৩.৬০।
হিসাবটি হচ্ছে—
Audited P/E = ৩১.১০ ÷ ৮.৭১ = ৩.৫৭ বা প্রায় ৩.৬০।
এর অর্থ, সিটি ব্যাংকের সর্বশেষ অডিট করা প্রতি এক টাকা আয়ের বিপরীতে বাজারে শেয়ারটির মূল্য প্রায় ৩ টাকা ৬০ পয়সা। অডিটেড হিসাব স্বাধীন নিরীক্ষকের যাচাই ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হওয়ায় সাধারণত এর নির্ভরযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি। তবে এটি সর্বশেষ চলমান সময়ের পরিবর্তে বিগত সম্পূর্ণ অর্থবছরের ফলাফল হওয়ায় কিছুটা পুরোনো চিত্র দিতে পারে।
তিনটি P/E-এর পার্থক্যের কারণ
একই শেয়ারদর ব্যবহার করা হলেও তিন ধরনের P/E-তে ভিন্ন EPS ব্যবহৃত হয়েছে। TTM P/E-তে সর্বশেষ টানা ১২ মাসের আয়, Unaudited P/E-তে সাম্প্রতিক অনিরীক্ষিত বা বার্ষিকীকৃত আয় এবং Audited P/E-তে সর্বশেষ সম্পূর্ণ অডিট করা বছরের আয় বিবেচিত হয়েছে। ফলে P/E তিনটির মান এক হওয়া স্বাভাবিক নয়।
সিটি ব্যাংকের TTM EPS ৯.৮৬ টাকা, যা ২০২৫ সালের Audited EPS ৮.৭১ টাকার তুলনায় ১.১৫ টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে TTM EPS অডিটেড EPS-এর চেয়ে প্রায় ১৩.২ শতাংশ বেশি। শেয়ারদর একই থাকায় এই উচ্চ EPS-এর কারণে TTM P/E নেমে এসেছে ৩.১৫-তে। এটি সাম্প্রতিক ১২ মাসে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় আগের অডিটেড বছরের তুলনায় বেড়েছে—এমন একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
প্রদত্ত বাজারতথ্যে আরও দেখা যায়, সিটি ব্যাংকের শেয়ারটির ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ দর ছিল ৩৩.৯০ টাকা এবং সর্বনিম্ন দর ছিল ২২.৬০ টাকা। সর্বশেষ দর ৩১.১০ টাকা হওয়ায় শেয়ারটি ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ দরের তুলনায় ২.৮০ টাকা বা প্রায় ৮.৩ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, ৫২ সপ্তাহের সর্বনিম্ন দরের তুলনায় বর্তমান দাম প্রায় ৩৭.৬ শতাংশ বেশি। তথ্যচিত্রে এক বছরে শেয়ারটির মূল্য প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বা NAV দেখানো হয়েছে ৩৭.৬০ টাকা। এর বিপরীতে বাজারদর ৩১.১০ টাকা হওয়ায় Price-to-Book বা P/B ratio আনুমানিক ০.৮৩। অর্থাৎ প্রদত্ত হিসাবে শেয়ারটি তার শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যের নিচে লেনদেন করছে। তবে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান, খেলাপি ঋণ ও সম্ভাব্য প্রভিশনের প্রভাব বিশ্লেষণ না করে শুধু NAV দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়।
তথ্যে ২০২৫ সালের জন্য ১৫ শতাংশ স্টক এবং ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের উল্লেখও রয়েছে। প্রদর্শিত Dividend Yield প্রায় ৪.৮২ শতাংশ। নগদ লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীর প্রত্যক্ষ আয় হলেও স্টক লভ্যাংশ নতুন শেয়ার হিসেবে প্রদান করা হয় এবং এটি নগদ আয়ের সমতুল্য নয়।
কম P/E কি নিশ্চিতভাবে ভালো?
P/E কম হওয়া সাধারণভাবে ইঙ্গিত দিতে পারে যে আয়ের তুলনায় শেয়ারটির বাজারমূল্য কম। তবে কম P/E মানেই শেয়ারটি নিশ্চিতভাবে অবমূল্যায়িত কিংবা ঝুঁকিমুক্ত—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আয় কমার আশঙ্কা, সম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ, বেশি খেলাপি ঋণ অথবা অতিরিক্ত প্রভিশনের প্রয়োজন থাকলেও বাজারে তার P/E কম থাকতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ার বিশ্লেষণে P/E-এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণের হার, ঋণক্ষতির প্রভিশন, মূলধন পর্যাপ্ততা, আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধি, নিট সুদ আয়, ROE, NAV, পরিচালন নগদপ্রবাহ এবং লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা দেখা জরুরি। এককালীন আয় বা হিসাবগত সমন্বয়ের কারণে EPS বেড়ে থাকলে ভবিষ্যতে একই আয় বজায় না-ও থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রদত্ত তথ্য অনুসারে সিটি ব্যাংকের TTM P/E ৩.১৫ এবং Audited P/E প্রায় ৩.৬০—দুটিই বর্তমান আয়ের তুলনায় তুলনামূলক কম মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে TTM EPS-এর বৃদ্ধি ব্যাংকটির সাম্প্রতিক আয় পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন নির্দেশ করছে। তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন, আয়ের উৎস ও স্থায়িত্ব এবং ব্যাংক খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই বিশ্লেষণ কেবল প্রদত্ত বাজারতথ্যের ব্যাখ্যা; এটি কোনো শেয়ার কেনা, ধরে রাখা বা বিক্রি করার সুপারিশ নয়।
No comments
Thank you, best of luck