জীবন বিনিময় (গোলাম মোস্তফা) কবিতা - বাংলা ১ম পত্র - এসএসসি।। NCTB BOOK
পুত্র তাঁহার হুমায়ুন বুঝি বাঁচে না এবার আর!
চারিধারে তার ঘনায়ে আসিছে মরণ-অন্ধকার ।
রাজ্যের যত বিজ্ঞ হেকিম কবিরাজ দরবেশ
এসেছে সবাই, দিতেছে বসিয়া ব্যবস্থা সবিশেষ,
সেবাযত্নের বিধিবিধানের ত্রুটি নাহি এক লেশ ।
তবু তাঁর সেই দুরন্ত রোগ হটিতেছে নাক হায়,
যত দিন যায়, দুর্ভোগ তার ততই বাড়িয়া যায়-
জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায় ৷
শুধাল বাবর ব্যগ্রকণ্ঠে ভিষকবৃন্দে ডাকি,
“বল বল আজি সত্যি করিয়া, দিও নাকো মোরে ফাঁকি,
এই রোগ হতে বাদশাজাদার মুক্তি মিলিবে নাকি?'
নতমস্তকে রহিল সবাই, কহিল না কোন কথা,
মুখর হইয়া উঠিল তাঁদের সে নিষ্ঠুর নীরবতা
শেলসম আসি বাবরের বুকে বিঁধিল কিসের ব্যথা!
হেনকালে এক দরবেশ উঠি কহিলেন- ‘সুলতান,
সবচেয়ে তব শ্রেষ্ঠ যে-ধন দিতে যদি পার দান,
খুশি হয়ে তবে বাঁচাবে আল্লা বাদশাজাদার প্রাণ ।’
শুনিয়া সে কথা কহিল বাবর শঙ্কা নাহিক মানি -
‘তাই যদি হয়, প্রস্তুত আমি দিতে সেই কোরবানি,
সবচেয়ে মোর শ্রেষ্ঠ যে ধন জানি তাহা আমি জানি ।’
এতেক বলিয়া আসন পাতিয়া নিরিবিলি গৃহতল
গভীর ধেয়ানে বসিল বাবর শান্ত অচঞ্চল,
প্রার্থনারত হাতদুটি তাঁর, নয়নে অশ্রু জল।
কহিল কাঁদিয়া- ‘হে দয়াল খোদা, হে রহিম রহমান,
মোর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আমারি আপন প্ৰাণ,
তাই নিয়ে প্রভু পুত্রের প্রাণ কর মোরে প্রতিদান ।
স্তব্ধ-নীরব গৃহতল, মুখে নাহি কারো বাণী
গভীর রজনী, সুপ্তি-মগন নিখিল বিশ্বরাণী,
আকাশে বাতাসে ধ্বনিতেছে যেন গোপন কি কানাকানি ।
সহসা বাবর ফুকারি উঠিল - ‘নাহি ভয় নাহি ভয়,
প্রার্থনা মোর কবুল করেছে আল্লাহ যে দয়াময়,
পুত্র আমার বাঁচিয়া উঠিবে - মরিবে না নিশ্চয় ।
ঘুরিতে লাগিল পুলকে বাবর পুত্রের চারিপাশ
নিরাশ হৃদয় সে যেন আশার দৃপ্ত জয়োল্লাস,
তিমির রাতের তোরণে তোরণে উষার পূর্বাভাস ।
সেইদিন হতে রোগ-লক্ষণ দেখাদিল বাবরের,
হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করিল শয্যা সে মরণের,
নতুন জীবনে হুমায়ুন ধীরে বাঁচিয়া উঠিল ফের।
মরিল বাবর - না, না ভুল কথা, মৃত্যু কে তারে কয়?
মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়,
পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়!
১. উদ্দীপক: এক ভয়াবহ বন্যায় গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে। বিত্তবান মহসিন সাহেব তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নৌকায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছিলেন। মাঝপথে নৌকাটি ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে ফুটো হয়ে যায়। নৌকাটি ডুবুডুবু অবস্থায় মহসিন সাহেব দেখলেন, নৌকায় থাকা লাইফ জ্যাকেট মাত্র একটি। তিনি সেটি দ্রুত নিজের ছেলেকে পরিয়ে দেন এবং নিজে উত্তাল স্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কয়েক ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মহসিন সাহেবের নিথর দেহ ভেসে ওঠে চরে। গ্রামবাসী সজল নয়নে বলে, "মহসিন সাহেব নিজে মরেও ছেলের মাঝে বেঁচে রইলেন।"
ক. 'জীবন বিনিময়' কবিতায় কার শয্যা পাশে মরণ-অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল? ১
খ. "জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায়" — পঙ্ক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে? ২
গ. উদ্দীপকের মহসিন সাহেবের কাজের মধ্যে 'জীবন বিনিময়' কবিতার বাদশা বাবরের যে মানসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে, তা বর্ণনা করো। ৩
ঘ. "মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়" — উদ্দীপক ও কবিতার আলোকে এই উক্তির সার্থকতা বিচার করো। ৪
২. উদ্দীপক: বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড. আসাদ একটি মরণব্যাধি ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে মগ্ন। তার একমাত্র কিশোরী কন্যা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর লড়ছে। প্রতিষেধকের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিজের শরীরের ওপর করা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও ড. আসাদ কন্যার জীবন বাঁচাতে নিজের রক্তে সেই ভাইরাস পুশ করেন এবং সেখান থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি করে কন্যাকে সুস্থ করে তোলেন। তবে দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ড. আসাদ ধীরে ধীরে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যান। তিনি হাসিমুখে বলেন, "আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন আজ সার্থক।"
ক. দরবেশের মতে বাদশা বাবরের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধন কোনটি? ১
খ. বাদশা বাবরের কেন চোখে ঘুম নেই? ২
গ. উদ্দীপকের ড. আসাদের 'সেরা অর্জনের' ভাবনাটি 'জীবন বিনিময়' কবিতার বাবরের 'শ্রেষ্ঠ ধন' উৎসর্গের ভাবনার সাথে কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ. "পিতৃস্নেহের কাছে হইয়াছে মরণের পরাজয়" — 'জীবন বিনিময়' কবিতা ও উদ্দীপকের প্রেক্ষিতে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো। ৪
৩. উদ্দীপক: রফিক সাহেব তার বৃদ্ধ বয়সে জমানো সমস্ত টাকা দিয়ে হজ্জে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় তার প্রতিবেশী এতিম ছেলেটির হার্টে ছিদ্র ধরা পড়ে। অপারেশনের জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন। রফিক সাহেব নিজের হজ্জের টাকা অকাতরে সেই ছেলের চিকিৎসার জন্য দিয়ে দিলেন। তার প্রার্থনা ছিল, "প্রভু, আমার ইবাদতের চেয়ে এই প্রাণটি বাঁচানো তোমার কাছে নিশ্চয়ই বেশি প্রিয়।" ছেলেটি সুস্থ হয়ে ফিরে এলে রফিক সাহেব পরম তৃপ্তি পান, যদিও তার হজ্জে যাওয়া আর হয়ে ওঠে না।
ক. 'জীবন বিনিময়' কবিতাটি কোন কবির লেখা? ১
খ. "মুখর হইয়া উঠিল তাঁদের সে নিষ্ঠুর নীরবতা"-কেন এই নীরবতাকে মুখর ও নিষ্ঠুর বলা হয়েছে? ২
গ. উদ্দীপকের রফিক সাহেবের প্রার্থনার ধরন 'জীবন বিনিময়' কবিতার বাদশা বাবরের প্রার্থনার সাথে কীভাবে সংগতিপূর্ণ? আলোচনা করো। ৩
ঘ. "ত্যাগের মহিমাই প্রকৃত অমরত্ব দান করে" — উদ্দীপক ও 'জীবন বিনিময়' কবিতার আলোকে উক্তিটির যৌক্তিকতা নিরূপণ করো। ৪
No comments
Thank you, best of luck