‘সংস্কৃতির ছোঁয়ায় মানবিকতার জাগরণ’ গ্রেগরিয়ানদের তিন দিনের উৎসব সমাপ্ত হলো উৎসবমুখর আয়োজনে।
‘সাংস্কৃতিক চর্চায় মানবিকতার জয়গান’ এই প্রেরণাদায়ী শ্লোগানকে ধারণ করে সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিন দিনব্যাপী SGHSC Annual Cultural & Art Festival–2026 আজ (শনিবার) সন্ধ্যায় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সফলভাবে শেষ হয়েছে। গত ২৩ জুলাই শুরু হওয়া এ বর্ণাঢ্য আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ, সৃজনশীল পরিবেশনা এবং শিল্প-সাহিত্যের সমৃদ্ধ উপস্থাপনায় ছিল উৎসবমুখর।
সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের গ্রেগরিয়ান কালচারাল ক্লাব, গ্রেগরিয়ান আর্ট অ্যান্ড হ্যান্ডরাইটিং ক্লাব এবং গ্রেগরিয়ান ড্রামা অ্যান্ড ফিল্ম ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবটি ছিল শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চার এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে তোলে।
উৎসবের উদ্বোধন হয় ২৩ জুলাই, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিস্টার মেবেল কস্তা, RNDM, প্রিন্সিপাল, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস’ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাদার লিওনার্ড চন্দন রোজারিও, CSC, ভাইস প্রিন্সিপাল, সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত প্রিন্সিপাল ব্রাদার প্লাসিড পিটার রিবেরু, CSC। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন গ্রেগরিয়ান কালচারাল ক্লাবের মডারেটর পতিতপাবন মণ্ডলসহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধান অতিথি শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চায় আরও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মানবিক বিকাশ ঘটে।” তিনি বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কিছুটা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রিন্সিপাল ব্রাদার প্লাসিড পিটার রিবেরু শিক্ষার্থীদের ক্লাবভিত্তিক কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সংস্কৃতি মানুষকে শুধু বিনোদন দেয় না, এটি মানুষকে মানবিক করে তোলে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কৃতির চর্চা আমাদের মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করে।” তিনি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশে এই ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে নানা প্রতিযোগিতা ও পরিবেশনার আয়োজন ছিল, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে ছিল ইংরেজি ও বাংলা কবিতা আবৃত্তি, ছড়া গান, দেশাত্মবোধক গান, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, লোকসঙ্গীত, আধুনিক গান, বাংলা ব্যান্ড সংগীত, ড্রয়িং/অঙ্কন, হাতের লেখা, একক অভিনয় এবং দলীয় অভিনয়। প্রতিটি ইভেন্টে শিক্ষার্থীরা অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভার পরিচয় দেয়, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল নাট্য পরিবেশনাগুলো, যেখানে শিক্ষার্থীরা সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা, মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো সৃজনশীলভাবে তুলে ধরে। এছাড়া চিত্রাঙ্কন ও হাতের লেখার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের নান্দনিকতা ও সূক্ষ্ম শিল্পবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
আজ ২৫ জুলাই বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিকা আমিন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করে। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
গেস্ট অব অনারদের বক্তব্যে তাঁরা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। নাসির উদ্দিন খান বলেন, “শিল্প ও সংস্কৃতি মানুষকে আলোকিত করে, এটি আমাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং সমাজকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করে।” তানজিকা আমিন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “নিজের প্রতিভাকে লালন করো, সাহসের সঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করো তবেই সফলতা আসবে।”
সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রিন্সিপাল ব্রাদার প্লাসিড পিটার রিবেরু, CSC। তিনি তাঁর বক্তব্যে আয়োজনের সফলতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের আয়োজন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আয়োজকরা জানান, এই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু বিনোদন নয়, বরং তাদের ভেতরের সৃজনশীল শক্তি ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানোই ছিল মূল লক্ষ্য। তারা বিশ্বাস করেন, এ ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বগুণ এবং দলগত কাজের মনোভাব তৈরি করতে সহায়তা করে।
উৎসবের সার্বিক আয়োজনে পূবালী ব্যাংক পিএলসি বিশেষ সহযোগিতা প্রদান করেছে, যা আয়োজকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আয়োজকরা এই সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিন দিনের এই বর্ণাঢ্য আয়োজন শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দর্শক ও অভিভাবকরাও উৎসবটি উপভোগ করেছেন। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং সৃজনশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
পরিশেষ বলা যায়, SGHSC Annual Cultural & Art Festival–2026 শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনই নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মানবিক, নান্দনিক ও সৃজনশীল বিকাশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই উৎসব ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং একটি সুন্দর, মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমনটাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।

































































No comments
Thank you, best of luck