দশম, নবম, অষ্টম, সপ্তম শ্রেণি।। বাংলা দ্বিতীয় পত্র।। ভাবসম্প্রসারণ।। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।।
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।।
মানুষের দেহের মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু যিনি মহৎ কর্ম দ্বারা সমাজ ও মানবজাতির কল্যাণ সাধন করেন, তাঁর কীর্তি চিরকাল বেঁচে থাকে। দেহের বিনাশ হলেও কর্মের মাধ্যমে তিনি অমরত্ব লাভ করেন। তাই বলা হয়, কীর্তিমানের প্রকৃত মৃত্যু নেই।
মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। জন্ম হলে মৃত্যু অবধারিত। এটাই প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। কিন্তু মানুষের জীবনের মূল্য কেবল তার আয়ুষ্কালের দৈর্ঘ্যে নিহিত নয়, বরং সেই জীবনে সে কী রেখে যায় তার উপর নির্ভরশীল। কেউ কেউ দীর্ঘজীবী হয়েও নিষ্ফল, অর্থহীন জীবনযাপন করে চলে যান, তাঁদের অস্তিত্ব সমাজে কোনো ছাপ রাখে না। পক্ষান্তরে কেউ কেউ স্বল্পায়ু হয়েও তাঁদের মহৎ কর্ম, ত্যাগ, জ্ঞান বা সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করে যান যে তাঁদের নাম যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে অম্লান থাকে। বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজসংস্কারক, বিপ্লবী—যাঁরা নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন, তাঁদের দেহ ধ্বংস হলেও তাঁদের সৃষ্টি, আদর্শ ও অবদান কালের গর্ভে হারিয়ে যায় না। তাঁরা তাঁদের কীর্তির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন মানুষের স্মৃতিতে, ইতিহাসের পাতায়, সভ্যতার অগ্রগতিতে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দেহ কেবল তার আত্মার আধার মাত্র, আর কর্মই তার প্রকৃত পরিচয়। তাই যিনি সৎকর্ম, জ্ঞানসাধনা কিংবা মানবসেবার মাধ্যমে নিজেকে অমর করে তোলেন, মৃত্যু তাঁর কাছে পরাজিত হয়। এই কারণেই কবি-সাহিত্যিকেরা বলেছেন, দেহের মৃত্যু হলেও কীর্তির মৃত্যু নেই—কীর্তিমান মানুষ চিরঞ্জীব। ইতিহাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কিংবা রবার্ট কোচ, তাঁদের দেহাবসান ঘটলেও তাঁদের সাহিত্যকর্ম, সমাজসংস্কার বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আজও মানুষকে আলোকিত করছে। তাঁরা সময়ের সীমা অতিক্রম করে আজও জীবন্ত।
সুতরাং, দেহের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী হলেও কর্মের মাধ্যমে মানুষ চিরস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রকৃত জীবনের সার্থকতা দীর্ঘ আয়ুতে নয়, বরং মহৎ কর্মে। আমাদের উচিত এমন কর্ম করা, যাতে মৃত্যুর পরও আমরা মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে পারি।
No comments
Thank you, best of luck