শেয়ার বাজারে বিনিয়োগে সফল হতে চান? জেনে নিন ৬টি গুরুত্বপূর্ণ টেকওয়ে
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা একটি চিরচেনা শব্দ। অনেক সময় দেখা যায় ভালো কোম্পানি লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করার পরেও শেয়ারের দাম বাড়ছে না, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া চ্যালেঞ্জিং, তখন প্রয়োজন ডাটা-চালিত বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। রয়্যাল ক্যাপিটালের হেড অফ রিসার্চ আকরামুল আলমের গত এক দশকেরও বেশি সময়ের বাজার পরিসংখ্যান এবং অভিজ্ঞ বিশ্লেষণের আলোকে এই নিবন্ধে সেরা বিনিয়োগ কৌশলগুলো আলোচনা করা হলো।
১. সিজনাল ম্যাজিক: বছরের কোন ৪ মাস মার্কেট সবচেয়ে ভালো থাকে?
গত ১২-১৩ বছরের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে পুঁজিবাজারের পারফরম্যান্স অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে সাধারণত ৪টি মাস মার্কেট সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থাকে।গুরুত্বপূর্ণ মাসসমূহ: জানুয়ারি, জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর।
পজিশন ট্রেডিং ও ব্রেকআউট: স্ট্যাটিস্টিক্যাল ডাটা অনুযায়ী, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাস সাধারণত বড় কোনো উত্থানের সময় নয়। বরং এই সময়টি শেয়ারে পজিশন নেওয়ার জন্য সেরা। বিনিয়োগকারীরা যখন এই সময়ে শেয়ার সংগ্রহ করতে থাকেন, তার প্রতিফলন ঘটে জানুয়ারিতে। বছরের এই প্রথম মাসে সাধারণত বাজারের বড় ধরনের ব্রেকআউট বা উত্থান লক্ষ্য করা যায়।
"বছরে চার মাস ইউজুয়ালি মার্কেট ভালো থাকে। মেজরিটি কেসে জানুয়ারি, জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর—এই চার মাসে টার্নওভার গ্রোথ এবং ইনডেক্সের পজিটিভ মুভমেন্ট থাকে।"
২. ডিভিডেন্ড প্যারাডক্স: লভ্যাংশ ঘোষণার পর শেয়ারের দাম কমে কেন?
অনেক কোম্পানি ৫০% এর বেশি ডিভিডেন্ড বা দ্বিগুণ আর্নিংস গ্রোথ দেখানোর পরেও ঘোষণার পর দাম কমে যায়। এর প্রধান কারণ মূলত ফান্ড ফ্লো (Fund Flow)। লভ্যাংশ ঘোষণার পর নিয়মিত ডে-ট্রেডাররা সেই শেয়ার থেকে প্রফিট টেকিং করে স্মল-ক্যাপ বা মিড-ক্যাপ কোম্পানিতে চলে যান। এর ফলে ভালো ফান্ডামেন্টাল শেয়ারেও সাময়িকভাবে তারল্যের অভাব দেখা দেয়।
তবে এই সাময়িক দরপতন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ। যেমন—ব্র্যাক ব্যাংক বা মবিল যমুনার ক্ষেত্রে যারা সঠিক সময়ে পজিশন নিয়েছিলেন, তারা দীর্ঘমেয়াদে উইনফল প্রফিট অর্জন করেছেন। মনে রাখবেন, ডে-ট্রেডাররা বাজারে তারল্য তৈরি করেন, কিন্তু সম্পদ বা ওয়েলথ তৈরি হয় ভ্যালু ইনভেস্টিং এর মাধ্যমে।
৩. ট্রেজারি বন্ড থেকে ইক্যুইটি: পরবর্তী বড় সুযোগ কোথায়?
বাংলাদেশের বিনিয়োগ বাজারে ট্রেজারি বন্ড এক সময় ১২.৮০% পর্যন্ত রিটার্ন দিয়েছিল, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছিল। তবে বর্তমানে এই সুদের হার নিম্নমুখী।
বাজার পরিস্থিতি
শেয়ার বাজারের সম্ভাব্য প্রভাব
প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ (Institutional Behavior)
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ৫-৬ মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এক্সপেনশনারি মানিটারি পলিসি (Expansionary Monetary Policy) গ্রহণ করে, তবে বাজারে বিশাল তারল্য প্রবাহ দেখা দেবে। এর ফলে সূচক বর্তমান অবস্থান থেকে আরও প্রায় ১,৫০০ পয়েন্ট বাড়তে পারে এবং দৈনিক লেনদেন বা টার্নওভার ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. সেরা শেয়ার বাছাইয়ের ৩টি গোল্ডেন রুল একজন দক্ষ বিশ্লেষকের মতে, শেয়ার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিচের তিনটি মানদণ্ড বা 'গোল্ডেন রুল' অনুসরণ করা উচিত:
১. গ্রোথ (Growth): কোম্পানির রেভিনিউ এবং প্রফিট প্রতি বছর ডাবল ডিজিটে বাড়তে হবে। ওয়ারেন বাফেটের ভাষায়, এটিই কোম্পানির জন্য একটি শক্তিশালী ইকোনমিক মোট (Economic Moat) তৈরি করে। ২. ক্যাশ জেনারেশন ক্যাপাসিটি (Cash Generation): শুধু খাতায়-কলমে মুনাফা নয়, কোম্পানির হাতে নগদ অর্থ থাকতে হবে। বিশেষ করে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো (Free Cash Flow) পজিটিভ হওয়া জরুরি। ৩. রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (Risk Management): কোম্পানিটি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কতটা সক্ষম বা শকপ্রুফ (Shockproof) কি না তা যাচাই করতে হবে।
৫. গ্রীন জোন এবং সম্ভাবনাময় খাতসমূহ:
বিনিয়োগের জন্য বর্তমানে ব্যাংকিং, এফএমসিজি (FMCG), সিমেন্ট এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাত বেশ সম্ভাবনাময়। তবে ব্যাংক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।ব্যাংকিং খাত: শুধুমাত্র গ্রীন জোন (Green Zone) ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ করা উচিত। যেসব ব্যাংকের কোনো ক্যাপিটাল শর্টফল বা প্রভিশন শর্টফল নেই (যেমন: সিটি ব্যাংক বা ইস্টার্ন ব্যাংক-EBL), তারাই ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
অন্যান্য খাত: সিমেন্ট খাতে লাফার্জ-হোলসিম বর্তমানে বেশ আন্ডারভ্যালুড অবস্থায় আছে। এছাড়া সিঙ্গার বাংলাদেশ তাদের বিজনেস রিস্ট্রাকচারিং করার মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও তারা বর্তমানে বেশ লিভারেজড (ঋণগ্রস্ত) অবস্থায় আছে।
৬. কমোডিটি মার্কেট: বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন দিগন্ত
বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও ডাইভার্সিফিকেশনের জন্য গোল্ড, পাম অয়েল এবং সিলভারের ফিউচার ট্রেডিং একটি যুগান্তকারী সম্ভাবনা। এটি মূলত দুটি বড় সমস্যার সমাধান করবে:প্রাইস ডিসকভারি (Price Discovery): এর মাধ্যমে পণ্যের সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারিত হবে, ফলে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ কমে যাবে।
হেজিং (Hedging):
ব্যবসায়ী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এর মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য লোকসান থেকে সুরক্ষা বা রিস্ক ম্যানেজমেন্ট করতে পারবেন। যেমন—ভবিষ্যতে সোনার দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকলে কমোডিটি পজিশন নিয়ে সেই বাড়তি খরচ সমন্বয় করা সম্ভব।
পুঁজিবাজারে সফল হতে হলে বাজার বিশ্লেষণ এবং ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে যখন বাজার কিছুটা ডাল (Dull) থাকে, তখন মানসম্পন্ন শেয়ারগুলোতে পজিশন নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিয়ে সঠিক খাতে সম্পদ বন্টন আপনাকে একজন সফল বিনিয়োগকারী হিসেবে গড়ে তুলবে।
আপনি কি আপনার পোর্টফোলিওকে পরবর্তী ব্রেকআউটের জন্য প্রস্তুত করেছেন?
No comments
Thank you, best of luck