ডাক্তারির স্বপ্নপূরণ: ইউনানী ও আয়ুর্বেদিকের হাত ধরে এক নতুন দিগন্ত
ডাক্তারির স্বপ্নপূরণ: ইউনানী ও আয়ুর্বেদিকের হাত ধরে এক নতুন দিগন্ত
মেধাবী আফসানার ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন সত্যি না হলেও, বিকল্প ধারার চিকিৎসায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন সম্ভাবনার নতুন পথ। দেশের একমাত্র সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে দিচ্ছে আধুনিক ও প্রাকৃতিক চিকিৎসার এক সম্মিলিত ভবিষ্যৎ।
আফসানা, একজন মেধাবী ছাত্রী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সামনের সারিতে স্থান করে নিয়েও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। মেডিকেলে ভর্তির চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত সুযোগ না পাওয়ায় তার সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
ঠিক এমন সময়ে তার ছোট বোন লিভারের জটিলতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আফসানার মা তাকে নিয়ে যান মিরপুরের সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল হাসপাতালে। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসায় যেখানে তিন মাসের কোর্স দেওয়া হয়েছিল, ইউনানীর চিকিৎসায় এক মাসের ওষুধেই মেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে।
হাসপাতালে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে আফসানার মায়ের চোখে পড়ে সেখানকার মেডিকেল কলেজ। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারেন, এটি আফসানার ডাক্তারি স্বপ্ন পূরণের একটি নতুন পথ হতে পারে। খোঁজখবর নিয়ে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখে আফসানা সেই কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দেয় এবং উত্তীর্ণ হয়। এমবিবিএস বা বিডিএস না হলেও, বিইউএমএস (ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি) পাশ করে ডাক্তার হওয়ার সুযোগ পেয়ে আফসানা ইউনানী শাখায় ভর্তি হন।
দেশের একমাত্র সরকারি স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ
মিরপুরের সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজটি দেশের একমাত্র স্নাতক (ব্যাচেলর) পর্যায়ের ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ। এখানে দুটি কোর্স চালু আছে—ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিইউএমএস) এবং ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিএএমএস)। এই দুটি কোর্সই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের অধিভুক্ত।
৫০টি আসনের মধ্যে ২৫টি ইউনানী এবং ২৫টি আয়ুর্বেদিক শাখার জন্য বরাদ্দ থাকে। লিখিত (এমসিকিউ) পদ্ধতির ১০০ নম্বরের পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়, যেখানে প্রতিবছর প্রায় এক হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। সরকারি-বেসরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কলেজের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজগুলোর (বিইউএমএস, বিএএমএস, বিএইচএমএস) ভর্তি পরীক্ষাও একই সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়।
আফসানার স্নাতক ডিগ্রি শেষ হতে আরও চার বছর লাগবে, এরপর এক বছরের শিক্ষানবিশকাল। অর্থাৎ, মোট ছয় বছরে এমবিবিএস সমমানের ডিগ্রি অর্জন সম্ভব। এরপর তার ইচ্ছে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের। এই কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে ভারত, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। দেশের ভেতরেও সাইকোলজি, নিউট্রিশন, মাইক্রোবায়োলজির মতো বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ আছে।
ড. মো. নাজমুল হুদা, এই কলেজের নবম ব্যাচের ছাত্র, এখানে পড়াশোনা শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোলজিতে এমফিল ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ২০১৩ সালে দেশে ফিরে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০১৪ সাল থেকে সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন।
আধুনিক চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক ওষুধের একীভূত পাঠক্রম
বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি হলেও বিইউএমএস ও বিএএমএস কোর্সের পাঠ্যসূচিতে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি, মেডিসিন, সার্জারি, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা, শিশু রোগবিদ্যা, কমিউনিটি মেডিসিন এবং ফরেনসিক মেডিসিনের মতো আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ন্যাচারাল মেডিসিনের জন্য পৃথক সিলেবাসও আছে।
ড. নাজমুল হুদা জানান, এখানে একটি ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রস্তুতপ্রণালি, সংরক্ষণ, মান রক্ষা, বাজারজাতকরণ—সবকিছুই হাতে-কলমে শেখানো হয়।
চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট – দুটি পথই খোলা
কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধি গাছের বাগান। চিকিৎসাশিক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন ও গবেষণার উদ্দেশ্যে গবেষণাগার, প্যাথলজি, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী ফার্মাকোলজির পৃথক ল্যাব, ফার্মেসি ল্যাব এবং অ্যানাটমি মিউজিয়াম রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী এখান থেকে শুধু চিকিৎসক নয়, বরং ফার্মাসিস্ট হিসেবেও কাজ করতে পারেন।
তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক, যিনি আয়ুর্বেদিক বিষয়ে পড়ছেন, ভবিষ্যতে প্রোডাকশন সেক্টরে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আমার ইচ্ছে প্রোডাকশনে যাবার। আবার ধরুন, সারাসপ্তাহ প্রোডাকশনে থেকে শুক্র ও শনিবার চেম্বারে বসতে পারব। এতে আমি আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার সাথেই যুক্ত থাকতে পারব।"
কলেজের একমাত্র আবাসিক হল, 'আবুল কাশেম হল' ছেলেদের জন্য বরাদ্দ। ছাত্রী সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার রাখা হয়েছে।
তৃতীয় বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রোডাকশন বিষয়ক পাঠ দেওয়া হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি একাডেমিক পাঠক্রমে মোট তিনটি প্রফেশনাল পরীক্ষা (প্রফ) হয়। প্রতি দেড় বছর পরপর একটি করে প্রফ ফাইনাল হয়। প্রথম প্রফের সময়সীমা দেড় বছর, দ্বিতীয় প্রফের দুই বছর এবং তৃতীয় প্রফের দেড় বছর। প্রথম প্রফে পাঁচটি কোর্স, দ্বিতীয় প্রফে আটটি এবং তৃতীয় প্রফে চারটি কোর্স থাকে।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহসান হাবীবের মতে, "আমাদের ওপর চাপ এমবিবিএস ছাত্রদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমরা কোনো ডিপ্লোমা করছি না বা ছোটখাটো কোর্স করে নামের আগে 'ডাক্তার' বসাচ্ছি না। আমাদেরও আইটেম পরীক্ষা, কার্ড ফাইনাল, টার্ম, প্রফ দিতে হয়। আর প্রফগুলোতে পাশ করতেও হিমশিম খেতে হয়।"
সুযোগ সীমিত হলেও সম্ভাবনা উজ্জ্বল
ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শত শত বছরের পুরোনো আদি চিকিৎসাপদ্ধতি। ভেষজ, প্রাণিজ ও খনিজ উপাদাননির্ভর এই চিকিৎসা সারা বিশ্বেই বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রাকৃতিক উপায়ে, তুলনামূলক কম খরচে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হওয়ায় এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগগুলোতে এর সফলতা উল্লেখযোগ্য।
২০১৩ সালে এখান থেকে পাশ করা ডা. মহিউদ্দীন আহমেদ বর্তমানে কলেজের বহির্বিভাগে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত। তিনি বলেন, "আমাদের কিন্তু অ্যালোপ্যাথি নিয়েও যথেষ্ট পড়াশোনা করতে হয়েছে বা হচ্ছে। কারণ, কোনো রোগী যখন আগে অ্যালোপ্যাথির ডাক্তার দেখিয়ে আমাদের কাছে আসেন, তখন জানতে হয় আগের ডাক্তার কী ওষুধ দিয়েছেন।"
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও, সরকারি মেডিকেল অফিসার হওয়ার সুযোগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্বাস্থ্য প্রকল্পে মেডিকেল প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করা যায়। স্কয়ার, একনে, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, রেডিয়েন্ট-এর মতো অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানিগুলোও ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক শাখা খুলেছে, যেখানে এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা কাজ করছেন।
ড. নাজমুল হুদা জানান, "এখান থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ জন বের হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ জন সরকারি চাকরিতে আছে। বাকি এক হাজার চেম্বার করছে, মেডিসিন ব্যবসা বা প্র্যাকটিস করছে। কেউ বসে নেই। কাজ করার সুযোগ কিন্তু আছে!"
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৪ সালে 'দেশীয় চিকিৎসা উন্নয়ন প্রকল্প' হিসেবে। ১৯৮৯ সালে এটি সরকারি ইউনানী-আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯০ সালের ১০ মার্চ প্রথম ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ২৯টি ব্যাচ পাশ করে বেরিয়ে গেছে।
'ন্যাচারাল মেডিসিনেই ফিরে যেতে হবে'
বর্তমান বিশ্বে অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারের (এএমসি) মাধ্যমে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল সিয়াম বলেন, "অল্টারনেটিভ মেডিসিনের যেমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তেমনি মডার্ন মেডিসিনও একটা সময় পর আর কাজ করবে না। অলরেডি আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স দেখা দিচ্ছে। তাই দরকার মডার্ন এবং ন্যাচারাল—এই দু'য়ের মধ্যে ইন্টিগ্রেশন। ভারতে অ্যালোপ্যাথিকে আয়ুর্বেদিকের সঙ্গে ব্রিজিং করে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবসময় বলছে, সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত হবে ইন্টিগ্রেশন হলে। আর খুব বেশিদিন বাকি নেই, যখন আমাদের এই ন্যাচারাল মেডিসিনেই ফিরে যেতে হবে।"
এখানে, আফসানা ও তার সহপাঠীরা কেবল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নই দেখছেন না, বরং দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
No comments
Thank you, best of luck