header ads

বহিপীর।। প্রশ্ন-উত্তর।। নবম-দশম শ্রেণি।। এসএসসি-২৭।।


প্রশ্ন-১
(ক) 'সূর্যাস্ত আইন' জমিদার হাতেম আলীর জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
(খ) বহিপীর ও হাতেম আলীর সম্পর্কের গতিপ্রकृति বিশ্লেষণ করো।

১(ক) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
'সূর্যাস্ত আইন' জমিদার হাতেম আলির জীবনকে চরম নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এই আইন অনুসারে তাঁর জমিদারি নিলামে উঠলে তিনি সর্বস্বান্ত হওয়ার সম্মুখীন হন।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৯৩ সালের সূর্যাস্ত আইন অনুযায়ী জমিদারদের রাজস্ব প্রদান করার জন্য সরকার নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিত। সেই সময়ের মধ্যে কোনো জমিদার যদি তার রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হতেন তবে তার জমিদারি নিলামে ওঠানো হতো। 'বহিপীর' নাটকে জমিদার হাতেম আলির ক্ষেত্রেও এই রকম চরম বাস্তবতা উপস্থিত হয়। টাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি শহরে আসেন ডাক্তার দেখানোর নাম করে। তিনি আশা করেছিলেন শহরে তাঁর বন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে ধার পাবেন। অতঃপর সেখানে ব্যর্থ হলে তাঁর অসহায়ত্বের সুযোগ নেন তাঁরই বজরায় আশ্রয় নেওয়া বহিপীর। মূলকথা হলো সূর্যাস্ত আইনের ফলে জমিদার হাতেম আলির অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়।

১(খ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। নাটক রচনায় তিনি যথেষ্ট মুনসিয়ানার পরিচয় তুলে ধরেছেন। তাঁর অন্যতম সাহিত্যকীর্তি 'বহিপীর' নাটকটি। নাটকটি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেঁকে বসা পিরপ্রথা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস নিয়ে। এর পাশাপাশি 'সূর্যাস্ত আইন' অনুযায়ী চরম বিপদাপন্ন জমিদারদের জীবনবাস্তবতাও ফুটে উঠেছে নাটকে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর ও জমিদার হাতেম আলির পারস্পরিক সমস্যা ও সমাধান নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁদের এই মুখোমুখি অবস্থানের স্বরূপ নিচে তুলে ধরা হলো-
তাহেরাকে খুঁজতে বেরিয়ে ঘটনাচক্রে বহিপীর ও তাঁর অনুচর হকিকুল্লাহ্ জমিদারের বজরায় এসে ওঠেন। জমিদার হাতেম আলির কাছে বহিপীর তাঁর পরিচয় তুলে ধরেন এবং জমিদার সাহেবও বহিপীরের কাছে তাঁর জমিদারির পরিচয় দেন। হাতেম আলি বলেন যে, তিনি অসুখের চিকিৎসা করার কথা বলে শহরে এলেও আসলে জমিদারি রক্ষার জন্য টাকার ব্যবস্থা করতে এসেছেন। কিন্তু তাঁর বাল্যবন্ধু আনোয়ারউদ্দিনের কাছ থেকে সাহায্য আশা করলেও সাহায্য জোটেনি। ফলে আগামীদিন সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাঁর জমিদারি নিলামে উঠবে। তাঁর এহেন দুরবস্থার কথা জানার পর পির সাহেবও তাঁর বাইরে বের হওয়ার আসল কারণ হাতেম আলির কাছে খোলাসা করেন। তিনি বলেন যে, তিনি তাঁর নববধূকে খুঁজতে বের হয়েছেন। তিনি অনেকটা নিশ্চিত হয়েছেন, তাঁর স্ত্রী তাহেরা জমিদারের বজরায় আছে। পির সাহেব তখন উভয়ের সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে জমিদার হাতেম আলির জমিদারি রক্ষার বিনিময়ে নিজের স্ত্রীকে ফেরত নিতে চান। নিজের সমস্যায় মগ্ন থাকায় প্রথমে হাতেম আলি বুঝতেই পারেন না যে, তাহেরার মুক্তির সাথে তাঁর জমিদারির সম্পর্ক কী। পরে অবশ্য তিনি নিজেই পির সাহেবের প্রস্তাব অন্যায্য মনে হওয়ায় নাকচ করে দেন। আর তাঁর পুত্র হাশেম তাহেরাকে পিরের কবল থেকে উদ্ধার করতে তাকে নিয়ে বজরা থেকে নেমে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। পির সাহেব ভাবতেও পারেননি যে, বিপদে চরমভাবে বিপর্যস্ত হাতেম আলি তাঁর এমন মোক্ষম প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারেন। এরপর নিজের মানবিকতা জাহির করতে তিনি শর্তহীনভাবে টাকা দিতে চান।

'বহিপীর' নাটকে বহিপীর ও জমিদার হাতেম আলি নিজ নিজ সমস্যা নিয়ে একই সমতলে অবস্থান করলেও হাতেম আলির ন্যায়পরায়ণতায় পির সাহেবের অন্যায় প্রস্তাব ব্যর্থ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে নাটকের কাহিনির উত্থান-পতনে তাঁদের দুজনের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

প্রশ্ন-২
(ক) 'খোদা কাকে কীভাবে পরীক্ষা করেন তা বুঝিবার ক্ষমতা আমাদের নাই।'- উক্তিটি কার? কেন তিনি এ কথা বলেছিলেন?
(খ) 'বহিপীর' নাটকে নাট্যকার কোন কোন সামাজিক সমস্যার আলোকপাত করেছেন? উদাহরণসহ আলোচনা করো।



২(ক) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
জমিদারি নিলামে ওঠার বিষয়ে হাতেম আলি বহিপীরকে জানালে বহিপীর প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেন।
'বহিপীর' নাটকে হাতেম আলির জমিদারি সূর্যাস্ত আইনে নিলামে ওঠার উপক্রম হলে তিনি টাকার ব্যবস্থা করতে শহরে আসেন। অন্যদিকে নিজের পালিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে খুঁজতে এসে ঘটনাচক্রে বহিপীর জমিদারের বজরায় আশ্রয় পান। তাদের দুইজনের কথোপকথনের এক পর্যায়ে হাতেম আলি তাঁর জমিদারি নিলামে ওঠার বিষয়টি পির সাহেবকে বলেন। তিনি অত্যন্ত মুষড়ে পড়েছেন দেখে পির সাহেব তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে একে 'খোদার পরীক্ষা' বলেন। অর্থাৎ, খোদার মর্জি যে মানুষের বোঝার পক্ষে সাধ্যাতীত- প্রশ্নোক্ত উক্তিতে সে বিষয়টিই ফুটে উঠেছে।

২(খ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অন্যতম সাহিত্যকীর্তি 'বহিপীর' নাটক। আলোচ্য নাটকে আবহমানকাল ধরে বঙ্গদেশে জেঁকে বসা পিরপ্রথা সম্পর্কিত তাঁর বাস্তব ধারণা ফুটে উঠেছে। তবে এর পাশাপাশি আমাদের যাপিত জীবনের সাথে সম্পৃক্ত আরও কিছু সামাজিক সমস্যা উঠে এসেছে নাটকটিতে। নিচে সেসব সমস্যা সম্পর্কে সম্যক ধারণা তুলে ধরা হলো-
পিরপ্রথা আমাদের বাঙালি সমাজে বহুকাল ধরে চলে আসছে। মূলত সুফিবাদী চিন্তাধারা থেকে পিরপ্রথার উৎপত্তি। তবে সময়ের সাথে সাথে এ প্রথায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বর্তমানে এক শ্রেণির ভণ্ডলোক ধর্মের নামে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে সম্মোহিত করে রেখেছে। 'বহিপীর' নাটকে বহিপীরও তেমনি একজন পির। তিনি ভক্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করেন এবং বলা চলে যে, ভক্তদের টাকাপয়সা বা দান দক্ষিণাতেই তাঁর জীবিকা চলে। ভক্তির প্রবলতায় তাঁর জনৈক শিষ্য নিজের কন্যাকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন।
অসম বয়সের বিয়ে নৈতিকতাবিরোধী। বিশেষত সেখানে যদি উভয়পক্ষের মতামত যাচাই করা না হয়। 'বহিপীর' নাটকে বৃদ্ধ পির তাঁর শিষ্যের কন্যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার সময় তার মতামত যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেননি। অথচ তাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান অনেক।
ধর্মান্ধতা আমাদের সমাজের অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা। নাটকে তাহেরার বাবা বৃদ্ধ পিরের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সময় ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রাধান্য দিলেও ধর্মান্ধতার কারণে যথোচিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এমনকি জমিদারগিন্নি খোদেজাও পিরের কথার বিরুদ্ধে যেতে সাহস করেনি অন্ধভক্তির কারণেই।
তৎকালীন সমাজে নারীর মতামতের মূল্য দেওয়া হতো না। এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নারীকে বিনিময়ের মাধ্যমও মনে করা হতো। 'বহিপীর' নাটকে পিরের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় মূলত তাহেরার বাবা তাকে বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ে দেয়। এতে কন্যাদানের বিপরীতে পুণ্য লাভ করবে- এমন মানসিকতা থেকেই সে একাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে।
উপরের আলোচনায় যেসব সামাজিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে 'বহিপীর' নাটকের এসবের বাইরে আরও অপ্রধান কিছু সমস্যাও উঠে এসেছে। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তাহেরা মরতে গেলে হাশেম তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার হাত ধরে, যা পির সাহেব অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে করেছেন। সন্তান হয়ে মায়ের সাথে যৌক্তিক তর্ককেও ধৃষ্টতা মনে করেছে খোদেজা। সব মিলিয়ে 'বহিপীর' নাটকে আমাদের বাঙালি সমাজের একটি যথার্থ চিত্র পাওয়া যায়।

প্রশ্ন-৩
(ক) তাহেরা কেন বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে চেয়েছিল? ব্যাখ্যা করো।
(খ) হাশেমকে কি প্রতিবাদী চরিত্র বলা যায়? তোমার মন্তব্যের পক্ষে যুক্তি প্রদান করো।

৩(ক) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
জমিদার হাতেম আলি তাকে আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেন, তাই জমিদারকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে তাহেরা বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে চেয়েছিল।
বৃদ্ধ বহিপীরের প্রতি প্রবল ভক্তি দেখাতে গিয়ে তাহেরার বাবা ও সৎমা তাকে বহিপীরের সাথে বিয়ে দেয়। এরূপ বিয়ে মানতে না পেরে তাহেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় এবং জমিদার হাতেম আলির বজরায় আশ্রয় পায়। বহিপীরও তাহেরাকে খুঁজতে গিয়ে ঘটনাচক্রে একই বজরায় এসে ওঠেন। বহিপীরের সাথে হাতেম আলির কথোপকথনে উভয়ের সমস্যার সমাধান হিসেবে পির সাহেব টাকার ব্যবস্থা করে হাতেম আলির জমিদারি রক্ষায় এগিয়ে আসতে চান; বিনিময়ে তিনি হাতেম আলির কাছ থেকে তাহেরাকে ফেরত চান। তাহেরা যখন জানতে পারে যে, বহিপীরের সাথে ফিরে গেলে তার বিপদে উপকার করা পুরো পরিবারটি বিপদমুক্ত হবে, তখন সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে প্রত্যুপকারী হতে চায়। তাই সে বহিপীরের সাথে ফিরে যেতে চেয়েছিল।
৩(খ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
'বহিপীর' নাটকে বাংলাদেশে আবহমানকাল ধরে চলে আসা পিরপ্রথার বিরুদ্ধে মানবতাবাদী ও প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে জমিদারপুত্র হাশেম আলির চরিত্রে। বহিপীরের কবল থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে আসা তাহেরাকে বাঁচাতে সে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
জমিদার হাতেম আলির একমাত্র পুত্র হাশেম। টগবগে তরুণ হাশেম শিক্ষালাভ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। পৈতৃক জমিদারি তাকে আকর্ষণ করে না। ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সে। তার বাবাও ছেলের এহেন ইচ্ছাকে স্বাগত জানান। তবে, জমিদারি নিয়ে সমস্যা হওয়ায় তিনি চিন্তিত। স্ত্রী-সন্তানকে না জানিয়ে, জমিদারি রক্ষার টাকা জোগাড় করতে শহরে এসেছেন তিনি। তাঁর সঙ্গী হয়েছেন তাঁর স্ত্রী খোদেজা এবং পুত্র হাশেম। মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ে দেওয়ায় তাহেরা বাড়ি থেকে পালিয়ে আশ্রয় পায় হাশেমদের বজরায়। তার সমস্যার কথা জেনে হাশেম চায় তাকে বাঁচাতে। এরপর বহিপীর বজরায় এসে উপস্থিত হলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। হাশেম আলি তাহেরাকে সমর্থন জানায়। এক পর্যায়ে হাশেম আলি সিদ্ধান্ত নেয়, বিয়ে করে হলেও তাহেরাকে সে বৃদ্ধ পিরের কবল থেকে রক্ষা করবে। তবে এতে বাধ সাধে তার মা খোদেজা। পিরভক্তির কারণে সে পিরের অভিশাপকে ভয় পায়। তবে জমিদারি-সম্পর্কিত মহাসমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে সে দমে যায়। এরপর যখন তাহেরাকে নিয়ে পির সাহেব বিভিন্ন চাল দিতে থাকে, তখন সব সংশয় কাটিয়ে সে তাহেরাকে নিয়ে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে।
হাশেম বয়সে তরুণ ও মানবীয় গুণে গুণান্বিত হওয়ায় তাহেরাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল। বহিপীরের মতো প্রবল শক্তি তাকে টলাতে পারেনি। সে অত্যন্ত যুক্তিবাদী, আধুনিক ও মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ। সে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যে সাহস ও সক্ষমতা দেখিয়েছে, তাতে তাকে একজন প্রতিবাদী চরিত্র বলা যায়।

প্রশ্ন-৪
(ক) 'কথ্য ভাষা হইল মাঠ ঘাটের ভাষা, খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা তাহার নাই।'- এ উক্তি কে এবং কেন করেছিল?
(খ) 'নাটকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক হচ্ছে তাহেরা।'- তাহেরা চরিত্রটির প্রধান বৈশিষ্ট্য নির্দেশপূর্বক এ মন্তব্য বিশ্লেষণ করো।

৪(ক) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
বহিপীর সব সময় বইয়ের ভাষায় কথা বলে। কথ্য ভাষা বাদ দিয়ে বইয়ের ভাষাকে বেছে নেওয়ার কারণ বোঝাতে বহিপীর প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীর। জমিদার হাতেম আলি পির সাহেবের নাম 'বহিপীর' হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন যে, দেশজুড়ে তাঁর অনেক ভক্ত থাকায় তাদের সাথে যোগাযোগে সহজবোধ্যতা আনতে তিনি বহি বা বইয়ের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। কেননা, তাঁর একার পক্ষে সব অঞ্চলের ভাষা আয়ত্ত করা অসম্ভব। আবার তাঁর কথ্য ভাষা বিভিন্ন অঞ্চলের ভক্তদের কাছে সহজে বোধগম্য হবে না। এর পাশাপাশি তাঁর মতে, তিনি যেহেতু খোদার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাই এতে গাম্ভীর্য থাকা চাই। কথ্য ভাষায় সেই গাম্ভীর্য ও উপযুক্ততা নেই মনে করে তিনি বলেছেন, 'কথ্য ভাষা হইল মাঠ ঘাটের ভাষা, খোদার বাণী বহন করার উপযুক্ততা তাহার নাই।'
অর্থাৎ, ধর্মীয় বক্তব্যে ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতেই বহিপীর বইয়ের ভাষায় কথা বলেন। সাধারণ কথ্য ভাষায় কথা বলেন না। এ বিষয়টি বোঝাতেই বহিপীর প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেন।

৪(খ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
বাংলা সাহিত্যে যে কজন কথাসাহিত্যিক স্বীয় বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত, তাঁদের অন্যতম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। 'বহিপীর' তাঁর সাহিত্যকীর্তির অন্যতম নিদর্শন। বাঙালি নারীও যে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, তারই সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে উক্ত নাটকের তাহেরা চরিত্রের মাধ্যমে।
তাহেরা 'বহিপীর' নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহিপীরের জনৈক ভক্তের কন্যা। সেই ভক্ত কুসংস্কার ও পিরভক্তির কারণে বৃদ্ধ পিরের সাথে নিজের তরুণী কন্যাকে বিয়ে দেন। বিয়েতে কন্যার সম্মতি আছে কি না, তা জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। ফলে বিয়ের পর তাহেরা বৃদ্ধ পিরকে স্বামী হিসেবে মানতে না পেরে এক চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। ডেমরার ঘাটে এসে চাচাতো ভাইটি নিরাশ্রয় হয়ে কান্নাকাটি করে ফিরে গেলেও অসীম সাহসী তাহেরা ফিরে যায়নি। এমতাবস্থায় তাকে আশ্রয় দেয় জমিদারগিন্নি খোদেজা। আশ্রয় পাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তাকে খুঁজতে বের হওয়া বহিপীরও তাঁর সহযোগী হকিকুল্লাহকে নিয়ে ঘটনাচক্রে একই বজরায় আশ্রয় নেন। এরপর বজরার মধ্যেই চলতে থাকে তাহেরাকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা।
পির সাহেব যখন বুঝতে পারেন যে, তাঁর বিবি উক্ত বজরাতেই আছে, তখন তিনি একের পর এক বুদ্ধি আঁটতে থাকেন তাকে ফিরিয়ে নিতে। অন্যদিকে তাহেরাও যেকোনো মূল্যে বহিপীরের কবল থেকে বাঁচতে বদ্ধপরিকর। এমতাবস্থায় জমিদারপুত্র হাশেম আলি এগিয়ে আসে তাকে উদ্ধার করতে পির সাহেবের নানা কলাকৌশলের কোনোটিই তাহেরার মনোভাব বদলাতে পারে না। এক পর্যায়ে সে নতুন জীবনের সন্ধানে হাশেম আলির হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে।

উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, তাহেরা স্বাধীন সত্ত্বার অধিকারী। ঠিকানাবিহীন হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনা শুধু সাহস নয়, দুঃসাহসের পরিচয় বহন করে। অধিকার সচেতন হওয়ায় পির সাহেবের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার লড়াই চালিয়ে গেছে সে। তাই বলা যায় যে, 'বহিপীর' নাটকে সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক হলো তাহেরা।

প্রশ্ন-৫
(ক) বহিপীর চরিত্রের ইতিবাচক উপাদানগুলো বর্ণনা করো।
(খ) সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামির যে চিত্র 'বহিপীর' নাটকে প্রতিফলিত তার পরিচয় দাও।

৫(ক) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
'বহিপীর' নাটকের বহিপীর নেতিবাচক চরিত্র হলেও বহিপীরের মাঝে কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যও লক্ষ করা যায়। যেমন: বইয়ের ভাষায় কথা বলা, ধর্মের উদারনৈতিক ব্যাখ্যা করা, বাস্তবতা মেনে নেওয়া ইত্যাদি।
বহিপীর প্রথাগত পিরের মতো হলেও তিনি ভাষা ব্যবহারে যথেষ্ট আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বইয়ের ভাষাকে গ্রহণ করেছেন আঞ্চলিকতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য। ভক্তবৃন্দের কাছ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে বিশাল ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হলেও জমিদারের বিপদে তিনি পাশে দাঁড়াতে তৎপর হয়েছেন। পালিয়ে যাওয়া স্ত্রী তাহেরাকে ফিরিয়ে নিতে চেয়ে তিনি মানবিকতা দেখিয়েছেন। মা-হারা তাহেরার প্রতি দয়ার্দ্র হয়েছেন। তিনি বুদ্ধি দিয়ে অবস্থা বিচার করেছেন। তাহেরার পালিয়ে যাওয়া মেনে নিয়ে বাস্তব জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। সবশেষে বিনা শর্তে টাকা দিতে চেয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এসবই বহিপীর চরিত্রের ইতিবাচক দিক।
৫(খ) নম্বর প্রশ্নের উত্তর
সমাজ-সচেতন কথাশিল্পীদের অন্যতম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। তারই অন্যতম নিদর্শন 'বহিপীর' শীর্ষক নাটকটি। এতে লেখক এ দেশে বহুকাল ধরে প্রচলিত পিরপ্রথার বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন।
বাঙালি সমাজে পিরপ্রথা এতোটাই জেঁকে বসেছে যে, পিরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি স্বাভাবিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে অন্ধভক্তিতে পরিণত হয়। 'বহিপীর' নাটকে তাহেরার বাবা ও সৎমা তাহেরাকে বৃদ্ধপিরের সাথে বিয়ে দিয়েছে অন্ধভক্তি থেকেই। এক্ষেত্রে তারা মেয়ের সম্মতি নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি। জমিদারগিন্নি খোদেজাও পিরভক্তি দেখাতে গিয়ে বিপদে আশ্রয় দেওয়া তাহেরাকে বহিপীরের হাতে তুলে দিতে চায়।
'বহিপীর' নাটকে পূণ্য লাভের আশায় জোর করে বৃদ্ধ পিরের সাথে তাহেরাকে বিয়ে দেওয়া। বাবা হয়েও মেয়ের ব্যাপারে এক মুহূর্ত ভাবেননি তিনি। এমনকি খোদেজার মতে, তাহেরা পালিয়ে এসে যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, নারী হিসেবে তা ঠিক হয়নি। বিয়ে হলো ভাগ্যের ব্যাপার তাই তাহেরাকে সে বহিপীরের কাছে ফিরে যেতে বলে।
যেকোনো পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, নারীকে পরপুরুষের ছোঁয়া থেকে বেঁচে থাকতে হবে- এমন মানসিকতা পির সাহেবের মাঝে দেখা যায়। তাহেরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চাইলে তাকে বাঁচাতে এসে হাশেম তার হাত ধরলে পির সাহেব এতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধতা প্রকাশ করেন।

উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, 'বহিপীর' নাটকে সমাজে প্রচলিত বেশকিছু ধর্মীয় গোঁড়ামির চিত্র ফুটে উঠেছে। সব মিলিয়ে নাটকে তৎকালীন সমাজচিত্রের যথার্থ রূপায়ণ ঘটেছে।

No comments

Thank you, best of luck

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.