ads

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যতের চাকরি

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে বদলে যাচ্ছে চাকরির ধরন। হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো পেশা এবং তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র। এর ফলে সারা বিশ্বে চাকরির বাজারে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে চলেছে। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বের ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ চাকরি হারাবে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের পরিবর্তে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ চালাবে বলে এই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এআই হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তি। মানুষের মস্তিষ্কের মতো চিন্তা-ভাবনা, বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকায় এআই দিয়ে সহজেই করা যাচ্ছে প্রাত্যহিক জীবনের অনেক কাজ। বর্তমানে বেশির ভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই এআই ব্যবহার করছে এবং অন্যান্য খাতের প্রতিষ্ঠানেও এর ব্যবহার দিনে দিনে বাড়ছে। ভবিষ্যতে শিল্পক্ষেত্রে বেশির ভাগ কাজই সম্পন্ন হবে এআইয়ের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, বেশির ভাগ শিল্প খাতেই আংশিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের পরিপূরক হিসেবেই কাজ করবে, তবে মানুষের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না।

চ্যাট জিপিটি, মাইক্রোসফট বিং, গুগল বার্ডের মতো এআই টুল মানুষের জীবনকে আরো সহজ ও গতিশীল করেছে। এআই যেমন বর্তমান চাকরির বাজারের জন্য এক আসন্ন বিপদ, তেমন ভবিষ্যত্ চাকুরির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা। এআইয়ের ফলে প্রায় ১০ ধরনের চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে কন্টেন্ট তৈরির কাজের মতো সৃজনশীল পেশাও। বিভিন্ন এআই টুলের সহায়তায় এখন অতি সহজে এবং স্বল্প সময়েই তৈরি করা যাচ্ছে বিভিন্ন ডিজাইন ও ভিডিও বানানোর কাজ। এছাড়া, ব্যাংকার, ট্যাক্সি ড্রাইভার, ট্রান্সলেটর, ক্যাশিয়ারের মতো কাজ অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে।

এআই কেবল চাকরি কেড়েই নেবে না, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এআইয়ের রয়েছ বিরাট ভূমিকা। যেসব নতুন কর্মসংস্থান এআই তৈরি করবে, তার মধ্যে রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নিত্যনতুন গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ায় গবেষক ও বিজ্ঞানীদের চাহিদা বাড়বে। ডেটা বিশ্লেষক, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন স্পেশালিস্ট এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ বেড়ে যাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে। ওয়ার্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে এআই ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে; ডেটা বিশ্লেষক, বিজ্ঞানী বা বিগ ডেটা অ্যানালিস্টের সংখ্যা বাড়বে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং ইরফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্টের সংখ্যা ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

অন্যান্য দেশের মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়া শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে এটুআইয়ের উদ্যোগে ১৬টি সেক্টরের ভবিষ্যত্ কর্মসংস্থানের ওপর একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। সেক্টরসমূহ হলো—রেডিমেড গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল, ফার্নিচার, এগ্রো-ফুড, লেদার, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, সিরামিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হেলথ কেয়ার, আইসিটি, কনস্ট্রাকশন, রিয়েল এস্টেট, ট্র্যান্সপোর্টেশন, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া এবং ইনফরমাল ও সিএমএসএমই। ফলাফলে দেখা যায়, ২০৪১ সাল নাগাদ এসব সেক্টরের বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭০ লক্ষাধিক লোক চাকরি হারাবে, আবার নতুন নতুন পেশায় ১ কোটি ১০ লক্ষাধিক চাকুরির বিশাল সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় উল্লেখযোগ্য পেশাসমূহ হলো—এআই স্পেশালিস্ট, ব্লকচেইন এক্সপার্ট, থ্রি ডি ডিজাইনার, কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স ম্যানেজার, এআর অ্যান্ড ভিআর ডেভেলপার, অকোনোমাস ভেহিক্যাল টেকনিশিয়ান, ড্রোন সার্ভেয়ার, সাইবার ফিজিক্যাল কন্ট্রোল সিস্টেম অপারেটর ও রোবট ডক্টর ভার্চুয়াল হোম এসিসট্যান্ট। নতুন এই বাজার চাহিদা অনুযায়ী, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেকার যুবকদের জন্য নানা রকম দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।

২০১৯ সালেও পাঁচটি সেক্টরের (এগ্রো-ফুড, ফার্নিচার, রেডিমেড গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি এবং লেদার) ওপর এটুআই কর্তৃক অনুরূপ গবেষণা পরিচালিত হয়। সেই গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, রেডিমেড গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরে বিদ্যমান পেশার ৬০ ভাগ, ফার্নিচার সেক্টরে ৬০ ভাগ, এগ্রো-ফুড সেক্টরে ৪০ ভাগ, লেদার সেক্টরে ৩৫ ভাগ এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি সেক্টরের ২০ ভাগ পেশা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যেসব পেশা, তা হলো গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরের ম্যানুয়াল সুইং মেশিন অপারেটর ও ফ্যাব্রিক কাটার; ফার্নিচার সেক্টরের ফার্নিচার ডিজাইনার ও ম্যানুয়াল অপারেটর; এগ্রো-ফুড সেক্টরের ম্যানুয়াল ফুড সর্টার ও প্যাকেজিং অপারেটর; লেদার সেক্টরের লেদার কাটার ও লেদার পলিশার এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি সেক্টরের ট্যুর গাইড ও ট্র্যান্সলেটর। ইতিমধ্যে এসব পেশায় কর্মরতদের চাকরি চলে যাওয়া শুরু হয়েছে, যাদের রিস্কিলিং (বিদ্যমান পেশা থেকে নবসৃষ্ট পেশায় স্থানান্তর) ও আপস্কিলিং (চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যমান পেশার উন্নয়ন) করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লক্ষাধিক বেকার যুব শ্রমবাজারে আসে। চাকরির বাজার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়ার কারণে বিশাল এই যুব জনগোষ্ঠীকে চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এর অন্যতম কারণ হলো, ৯৫ শতাংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার কোচ বা পরামর্শদাতা নেই, ৫৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মজীবন সম্পর্কিত সহায়ক কোনো সেবা নেই এবং ৯৪ শতাংশ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত কোনো কার্যক্রম নেই। বাংলাদেশে ৫০টির বেশি সরকারি-বেসরকারি ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেন্টার থাকলেও তাদের মধ্যে তেমন কোনো সমন্বয় নেই। প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যত্ কর্মোপযোগী ‘স্মার্ট নাগরিক’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি এ ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেন্টারসমূহ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘স্মার্ট ক্যারিয়ার গাইডেন্স নেটওয়ার্ক’।

বর্তমানে বাংলাদেশে যুব বেকারত্বের হার ১০.৬ শতাংশ এবং শিক্ষিত বেকারত্বের হার ৪৭ শতাংশ। পাশাপাশি শিক্ষা-দক্ষতা-কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে (এনইইটি—নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং) প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ যুব। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০১৯ :টারশিয়ারি এডুকেশন অ্যান্ড জব স্কিল’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্নাতক শেষ করার পর ৩৭ শতাংশ তরুণ ও ৪৩ শতাংশ তরুণীর চাকরি পেতে ন্যূনতম এক-দুই বছর সময় লাগে এবং মাত্র ১৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী স্নাতক পাশের পরপরই পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন চাকরি পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপের ত্রৈমাসিক তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এই বেকারত্বের মূল কারণ হলো সাপ্লাই (শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান) ও ডিমান্ডের (শিল্পপ্রতিষ্ঠান) মধ্যে সমন্বয়হীনতা। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে পাশকৃত যুবরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবসহ নানা কারণে দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্র ও পেশার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এর একটি বড় কারণ। আর এ কারণেই বেকার যুবদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে জেলায় জেলায় নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে ‘স্মার্ট এমপ্লয়মেন্ট ফেয়ার’।

সাপ্লাই (শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান) ও ডিমান্ডের (শিল্পপ্রতিষ্ঠান) মধ্যে ভার্চুয়ালি সমন্বয় সাধন করে বেকার যুবদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এটুআই কর্তৃক ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ফর স্কিলস, এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (নাইস) https://nise.gov.bd/ তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি রিয়েল টাইম ডেটা প্ল্যাটফরম। NISE-এর আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানবিষয়ক ২০টি বিভাগ/অধিদপ্তরের নিজস্ব পোর্টাল রয়েছে। বর্তমানে নাইসে ১০ লক্ষাধিক বেকার যুব, সহস্রাধিক দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান, ২ হাজারেরও অধিক কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। চাকরির বাজার সম্পর্কিত তথ্য ও আবেদন, ক্যারিয়ার গাইডেন্স সেবা, দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক তথ্য ও আবেদনসহ বেকার যুবদের জন্য প্রয়োজনীয় নানাবিধ সেবা রয়েছে এই প্ল্যাটফরমে। একজন বেকার যুব এই প্ল্যাটফরমে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/অধিদপ্তরের দক্ষতা উন্নয়নমূলক অকুপেশন/পেশায় ভর্তির আবেদন করতে পারে কিংবা বিভিন্ন কোম্পানির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চাকরিতে আবেদন করতে পারে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা দেখে তাদের নতুন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারছে। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ লোক এই প্ল্যাটফরম থেকে বাছাই করে নিতে পারছে। এভাবে নাইস বেকার যুবদের কাছে হয়ে উঠছে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ‘ওয়ান স্টপ হাব’। নাইস প্ল্যাটফরম দেশের সীমানা পেরিয়ে দেশের বাইরেও বেকার সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। এটুআইয়ের সহযোগিতায় সোমালিয়া ও জর্ডান সরকার এই প্ল্যাটফরর্মকে তাদের নিজ নিজ দেশের জন্য ব্যবহার করছে। আফ্রিকার দেশ সাও তোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপ ও ঘানা এই প্ল্যাটফরমকে তাদের দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে স্মার্ট কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের একটি বড় লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ইশতেহারে বেকার যুবদের সর্বশেষ হার ১০.৬ শতাংশ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ৩.০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৫ কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর তা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগীসহ সবাইকে কাজ করা প্রয়োজন একসঙ্গে, একযোগে ও এক লক্ষ্যে।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক


No comments

Thank you, best of luck

Theme images by sbayram. Powered by Blogger.