বাংলা দ্বিতীয় পত্র।। রচনা।। শিষ্টাচার।। সপ্তম শ্রেণি।। অষ্টম শ্রেণি।। নবম-দশম শ্রেণি।। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
১. ভূমিকা
"পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষায় শিক্ষিত হলেই তাকে শিক্ষিত বলা হয় না"-এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে উন্মোচন করে। প্রকৃত শিক্ষিত তিনিই, যাঁর শিক্ষা তাঁর কথা-বার্তায়, চাল-চলনে, কাজ-কর্মে সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়। বিদ্যা-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা প্রভৃতির একত্র সমাবেশে চিত্ত ও মনের যে প্রকৃত সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, ব্যবহারিক জীবনে তারই মাধুর্যময় রূপ হলো ‘শিষ্টাচার’ বা ‘আদব-কায়দা’। শিষ্টাচার শুধুমাত্র বাহ্যিক কোনো আচরণ নয়, এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। এই গুণটি কেউ জন্মগতভাবে নিয়ে আসে না; পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবিড় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তা অর্জন করতে হয়। ছাত্রজীবনই হলো শিষ্টাচার শেখার শ্রেষ্ঠ সময়, কারণ এই বয়সে মন থাকে কোমল ও কাদা মাটির মতো, যা সহজেই ছাঁচে গড়া যায়। আদব-কায়দা সম্পন্ন ব্যক্তি সমাজে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হন এবং তিনি তাঁর এই মহৎ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে সবাইকে আকৃষ্ট করতে পারেন। তাই মানবজীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম।
২. শিষ্টাচার: ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দর্পণ
শিষ্টাচার কেবল ব্যক্তির আচরণ নয়, এটি একটি জাতির সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতিতে অতিথি আপ্যায়ন, বড়দের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ এবং সৌজন্যমূলক সম্ভাষণের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘সালাম’ বা ‘আদাব’ জানিয়ে কুশল বিনিময়, ‘দয়া করে’ বা ‘ধন্যবাদ’ বলার মতো ছোট ছোট শব্দগুচ্ছের ব্যবহার শিষ্টাচারেরই অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শিষ্টাচারের আদিরূপ ভিন্ন হলেও, মূল সুরটি এক—মানবিক সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা। জাপানি সংস্কৃতিতে বিনয়ের সাথে মাথা নত করা (Bow) সম্মান প্রদর্শনের একটি শৈল্পিক রূপ। এই বৈচিত্র্যময় শিষ্টাচারগুলো প্রমাণ করে যে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের সাথে সাথে শিষ্টাচারের পরিধিও প্রসারিত হয়েছে এবং তা মানবিক সমাজ গঠনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
৩. শিষ্টাচারের স্বরূপ ও পরিধি
শিষ্টাচারের স্বরূপ অত্যন্ত গভীর এবং এর পরিধি ব্যাপক। এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং কর্মতৎপরতার এক অনবদ্য সমন্বয়। যখন কারো অন্তরে বিনয়, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তখন তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বাহ্যিক আচরণে ফুটে ওঠে। শিষ্টাচারের পরিধি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত এবং জাতীয় জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি যেমন মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পোশাকের রুচি) শেখায়, তেমনি অন্যকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং বিপদে সহমর্মিতার হাত বাড়ানোর মতো মহৎ গুণগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃত শিষ্টাচার হলো এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ, যা সমাজকে কলুষমুক্ত ও শান্তিময় রাখতে সহায়তা করে।
৪. শিষ্টাচারের মাধ্যম
শিষ্টাচার মানুষের মার্জিত আচরণের মূর্ত প্রতীক। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজে আমরা এই শিষ্টাচারের বিকাশ ঘটাতে পারি। আমাদের চলন-বলন, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং অভ্যাসগুলো শিষ্টাচারের সূচক হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যেমন—মাথার চুল কাটা থেকে পায়ের নখ কাটা এবং তা ভদ্রোচিতভাবে কাটা শিষ্টাচারের প্রাথমিক ধাপ। মানুষের সাথে সুন্দর, মার্জিত ও শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা এবং কনিষ্ঠদের স্নেহ প্রদর্শন করা এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া পোশাক-আশাকে উন্নত রুচির পরিচয় দেয়া, সময়ের মূল্য দেয়া এবং তা মেনে চলা, লেখাপড়ায় ভালো ফলাফল করার প্রচেষ্টা চালানো, সৎ পথে থাকা, সত্য কথা বলা ইত্যাদি সবই শিষ্টাচার প্রকাশের মাধ্যম। পক্ষান্তরে, বদমেজাজ, অসঙ্গত পোশাক-আশাক, উদ্ধত ব্যবহার, দুর্বিনীত আচরণ এবং অন্যের প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি কখনো শিষ্টাচারের অঙ্গ হতে পারে না।
৫. মানসিক প্রশান্তি ও শিষ্টাচার
শিষ্টাচারের সাথে মানুষের মানসিক প্রশান্তির এক নিগূঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান। যখন কেউ বিনয়ী ও মার্জিত আচরণ করে, তখন তার নিজের মনও শান্ত ও প্রফুল্ল থাকে। অন্যদিকে, উদ্ধত ও বদমেজাজি মানুষ সর্বদা এক ধরণের মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। শিষ্টাচার মানুষকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে শেখায়, যা জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস বা ‘ধন্যবাদ’ জানানো কেবল সৌজন্য নয়, এটি নিজের মনে ইতিবাচকতার সঞ্চার করে। যখন কোনো ব্যক্তি অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ায় বিশ্বাস রাখে, তখন তার জীবনে অনাবিল শান্তি বিরাজ করে। তাই শিষ্টাচার কেবল সমাজকে সুন্দর করে না, বরং ব্যক্তির আত্মিক উন্নতি ও প্রশান্তির পথ প্রশস্ত করে।
৬. শিষ্টাচারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
জীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। শিষ্টাচার মানুষের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জনে সাহায্য করে। এর ফলে সমাজে একদিকে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে, অন্যদিকে জনপ্রিয়তার সৃষ্টি হয়। শিষ্টাচারী ব্যক্তির নেতৃত্ব সহজেই সমাজ গ্রহণ করে এবং তিনি মহৎ কিছু কাজ করার সুযোগ পান। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে শিষ্টাচারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাহায্য করে, কারণ নিয়োগকর্তারা কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, বরং প্রার্থীর আচরণ ও ব্যক্তিত্বেরও মূল্যায়ন করেন। ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গ্রাহকের সাথে সুন্দর ও বিনয়ী ব্যবহার সফলতার অপূর্ব সুযোগ এনে দেয়।
৭. কর্মক্ষেত্রে ও পেশাগত জীবনে শিষ্টাচার
বর্তমান জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে পেশাগত শিষ্টাচার সাফল্যের অন্যতম মূল স্তম্ভ। এটি কেবল ঊর্ধ্বতন বা অধস্তনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও সততার সাথে কর্মসম্পাদনও এর অন্তর্ভুক্ত। সময়ের সঠিক ব্যবহার, সহকর্মীদের মতামতকে সম্মান করা, দলীয় কাজে সহযোগিতা করা এবং দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান হওয়া পেশাগত শিষ্টাচারের লক্ষণ। পেশাগত জীবনে সাফল্য লাভের জন্য যেমন কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে চলা। অশালীন ভাষা বা উদ্ধত আচরণ কর্মপরিবেশকে বিষিয়ে তোলে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে। পক্ষান্তরে, শিষ্টাচারী কর্মী সহজেই প্রতিষ্ঠানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ লাভ করেন।
৮. শিষ্টাচার শেখার উপায়
পরিবার শিষ্টাচার অর্জনের সূতিকাগার। পিতা-মাতা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে শিশুরা সর্বপ্রথম শিষ্টাচার অর্জনের পাঠ নিয়ে থাকে। শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণ প্রিয় এবং তারা পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের আচরণ দেখে শেখে। তাই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা যদি শিষ্টাচারী হয়, তবে শিশুরাও তা সহজেই আয়ত্ত করে নিতে পারে। শিশুরা স্বভাবতই সবকিছু শিখতে চায়, তাদের কেবল সঠিক নির্দেশনার প্রয়োজন। শিষ্টাচার শেখার দ্বিতীয় ক্ষেত্র হলো বিদ্যালয়। শিক্ষকদের দায়িত্ব শিশুদের কেবল পুঁথিগত বিদ্যা দান করা নয়, বরং তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নৈতিক ও সামাজিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। এছাড়া সমাজ, সামাজিকতা ও পরিবেশ থেকে শিশুরা শিষ্টাচারের নির্দেশনা নিতে পারে।
৯. ডিজিটাল যুগে শিষ্টাচার বা 'নেটশিষ্টাচার'
বিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে, যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, তখন শিষ্টাচারের পরিধি ইন্টারনেটের জগতে বা 'ভার্চুয়াল স্পেস'-এও সম্প্রসারিত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাকে 'নেটশিষ্টাচার' (Netiquette) বলা হয়। অন্যের পোস্টে অশালীন বা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা, তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করা, সাইবার বুলিং বা অন্যকে অনলাইনে হেনস্তা করা—এসবই অশিষ্টতার শামিল। ডিজিটাল যুগে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভার্চুয়াল জগতের ওপারেও একজন মানুষ আছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতামত প্রকাশে এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মার্জিত ভাষা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করা আধুনিক যুগের শিষ্টাচারের অপরিহার্য অংশ।
১০. পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি শিষ্টাচার
শিষ্টাচারের ধারণাটি কেবল মানবকেন্দ্রিক নয়, এটি পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতিও আমাদের দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তোলে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াও এক ধরণের শিষ্টাচার। যেখানে-সেখানে আবর্জনা না ফেলা, গাছপালা না কাটা বরং বেশি করে গাছ লাগানো, জল ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা, পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ না করা—এসবই পরিবেশগত শিষ্টাচারের অংশ। যদি কোনো সমাজ তার প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করে এবং সম্পদ অপচয় করে, তবে সে সমাজকে সত্যিকারের শিষ্টাচারী বলা যাবে না। প্রকৃতির প্রতি এই সৌজন্যবোধ কেবল পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখে না, বরং মানবিক মূল্যবোধের গভীরতাকেও প্রকাশ করে।
১১. পারিবারিক জীবনে শিষ্টাচার
আমরা সবাই শান্তিপ্রিয় জীবনযাপনে আগ্রহী। সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবন বিকাশের জন্য শিষ্টাচার অবশ্য প্রয়োজনীয়। পারিবারিক জীবন তথা সামাজিক জীবনে শিষ্টাচারই মানুষকে স্বাতন্ত্র্য দান করে। পারিবারিক জীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যে পরিবারের ছেলেমেয়েরা বাল্যকাল হতে শালীনতা ও সৌজন্য অভ্যস্ত হয়, পরিণত বয়সে তারা তাদের শিষ্টাচারের দ্বারা সবাইকে আকৃষ্ট করে। বিনয় ও সুন্দর ব্যবহার দ্বারা যেকোনো মানুষের মন জয় করা যায়। কে কতো ভদ্র, শিক্ষিত, রুচিশীল তার পরিচয় পাওয়া যায় শিষ্টাচারে। কোনো পরিবারকে আদর্শ পরিবারের স্বীকৃতি পেতে হলে সে পরিবারকে অবশ্যই শিষ্টাচার গুণসম্পন্ন হতে হবে। শিষ্টাচার একটা পরিবারকে মর্যাদার আসনে আসীন করে। পরিবারের সদস্যরা শিষ্টাচার গুণে সমাজজীবনে আদরণীয় হয়ে ওঠে। যে পরিবারের মধ্যে শিষ্টাচারের অভাব রয়েছে, সে পরিবারকে কেউ পছন্দ করে না। পারিবারিক জীবনে শিষ্টাচার শিক্ষায় অভিভাবকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। শিষ্টাচারের অভাবে কোনো পরিবারের সন্তান সমাজে কুসন্তান হিসেবে পরিচিত হয়। কাজেই, প্রত্যেক পরিবারের উচিত সন্তানদের শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে আদর্শ মানুষে পরিণত করা।
১২. জাতীয় জীবনে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিষ্টাচার
শিষ্টাচার কেবল ব্যক্তি বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত। দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণ করা নাগরিক শিষ্টাচারের অংশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শিষ্টাচার বা ‘প্রটোকল’ মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রতিনিধি অন্য কোনো দেশে যান, তখন তাঁদের মার্জিত ও সৌজন্যমূলক আচরণ সে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার পথকে প্রশস্ত করে। একটি শিষ্টাচারী জাতি বিশ্ব দরবারে সম্মানের আসনে আসীন হয় এবং তাদের সাথে অন্য দেশ সম্পর্ক স্থাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
১৩. সামাজিক জীবনে শিষ্টাচার
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে মিলেমিশে বসবাস করাই মানুষের ধর্ম। সমাজের বাইরে থেকে আমরা কেউই সুন্দর জীবনযাপন করতে পারি না। সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে কতিপয় গুণাবলি অর্জন করতে হয়, যার অন্যতম হলো শিষ্টাচার। সামাজিক জীবনে শিষ্টাচারের গুরুত্ব অপরিসীম। বদমেজাজি, ঔদ্ধত্য ও খারাপ লোকের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা সম্ভব নয়। এসব মানুষের কথাবার্তা, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যেও ঔদ্ধত্যের পরিচয় ফুটে ওঠে। মানুষ স্বাভাবিক কারণেই এ শ্রেণির লোকের সংস্রব এড়িয়ে চলে। যেসব মানুষের মধ্যে শিষ্টাচার গুণের অভাব রয়েছে, তারাই সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আত্মবিশ্বাসী মানুষ শিষ্টাচারী হতে কোনো দ্বিধা করে না। শিষ্টাচারের মাধ্যমে আমরা সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। প্রকৃত শিষ্টাচারের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না; এটা ফুলের মতোই সুন্দর ও স্বাভাবিক। যে সমাজে শিষ্টাচার নেই, সে সমাজকে অরণ্য বা বন্য সমাজের সাথে তুলনা করা যায়। কাজেই, সামাজিক জীবনে শিষ্টাচারের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে কলুষমুক্ত সমাজ গঠন করতে হবে।
১৪. শিষ্টাচারের সুফল ও প্রভাব
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের শিষ্টাচারের সুফলতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। শিষ্টাচার মানবজীবনকে সুন্দর ও মহিমান্বিত করে। বিনয়মধুর, সুশোভন, পরিশীলিত ও মার্জিত আচার-আচরণ মানুষকে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসে। শিষ্টতার ফলে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয় এবং সামাজিক সম্প্রীতি স্থায়ী রূপ লাভ করে। সমাজে মানুষে মানুষে চলাফেরার ফলে একজনের আচার-আচরণ অন্যজনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ভদ্র ও বিনয়ী ব্যবহারের একটি আলাদা শক্তি রয়েছে, যার সাহায্যে অনেক কঠিন কাজও সহজে আদায় করে নেওয়া যায়। শিষ্টাচার মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায় এবং তাকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা দান করে। তাই বলা যায়, শিষ্টাচার সকল ক্ষেত্রে, সর্বস্থানে সুফলতা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
১৫. শিষ্টাচার বর্জনের কুফল
শিষ্টাচার যেমন মানবচরিত্রের একটি মহিমান্বিত গুণ, তেমনি অশিষ্টতা বা অভদ্রতা চরিত্রের অধঃপতনের মূল কারণ। শিষ্টাচারের অভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। অশিষ্ট ব্যক্তি পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা স্বরূপ। উদ্ধত আচরণ, কর্কশ ভাষা এবং অন্যের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অহংকারী ও অশিষ্ট শাসকদের পতন অনিবার্য ছিল। ব্যক্তিজীবনে শিষ্টাচার বর্জন করলে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় এবং জীবনে প্রকৃত সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অশিষ্টতা মানুষের মানবিক গুণাবলিকে ধ্বংস করে দেয় এবং সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
১৬. উপসংহার
পরিশেষে এ কথাটিই দৃঢ়তার সাথে বলতে হয় যে, শিষ্টাচার অসংখ্য মানবিক গুণের সমষ্টিগত রূপ। এটি মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ অলংকার। শিষ্টাচার যেমন মানব চরিত্রের একটি মহিমান্বিত গুণ, তেমনি অশিষ্টতা চরিত্রের অধঃপতনের কারণ। শিষ্টাচারের গুণের মধ্যেই ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কাজেই, অশিষ্টতা বা অভদ্রতাকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে সহজ, সরল, ভদ্র ও মার্জিত আচার-আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তি চরিত্রের সুষমা ফুটিয়ে তোলার নিরন্তর চেষ্টাই হবে আমাদের প্রধান কর্তব্য। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি শিষ্টাচারী ও সুস্থ জাতি গঠন করা সম্ভব, যা আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখবে।
পতিতপাবন মণ্ডল (পাবন)
বাংলা বিভাগীয় প্রধান, সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ
No comments
Thank you, best of luck