শিক্ষা না কি শাস্তি? আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ৫টি কঙ্কালসার বাস্তবতা
শিক্ষা কি আসলেই আত্মার আলোকায়ন, নাকি এক সুপরিকল্পিত মানসিক নিপীড়ন? বর্তমান সময়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গভীর নৈরাশ্য ও হতাশা পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তা কেবল কোনো সাময়িক ক্ষোভ নয়—বরং এটি একটি জীর্ণ ও বিপথগামী শিক্ষাক্রমের করুণ আর্তনাদ। আমরা জ্ঞানার্জনকে একটি আনন্দময় যাত্রা হিসেবে দেখার বদলে একে এক ধরণের ‘শাস্তি’ বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করেছি। যেখানে পাঠ্যপুস্তকগুলো জীবনবোধ শেখানোর বদলে কেবল সময়ক্ষেপণ আর পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয় অনিবার্য। একজন সমাজ বিশ্লেষক হিসেবে আমাদের এই ঘুণে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থার ৫টি কঙ্কালসার বাস্তবতা তুলে ধরা আজ সময়ের দাবি।
পরীক্ষা ছাড়া ডিগ্রি: মেধার অবমূল্যায়ন ও এক নিষ্ঠুর পরিহাস
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘অটোপাস’ নামক যে ধারণাটি শেকড় গেড়েছে, তা মেধা বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। পরীক্ষা ব্যতিরেকে ডিগ্রি অর্জন কেবল শিক্ষার মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং একটি প্রজন্মকে অযোগ্যতার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—এই ব্যর্থতার দায়ভার কিন্তু শিক্ষার্থীদের নয়। তারা পরিস্থিতির শিকার। দীর্ঘ ১২ বছর পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি বা গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে ন্যূনতম যোগ্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই দায়ভার আমাদের রাষ্ট্র ও শিক্ষা ব্যবস্থার। কারণ, ১২ বছর ধরে আমাদের শিক্ষাক্রম তাদের ভাষা কিংবা জ্ঞান শেখানোর পরিবর্তে কেবল ‘নম্বর’ পাওয়ার নেশায় মত্ত রেখেছিল। তারা নিজেদের শিক্ষিত করেনি, বরং এই ঘুণে ধরা পদ্ধতি তাদের তথাকথিত 'শিক্ষিত' তকমা দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত এক করুণ পরিহাসে পরিণত হয়েছে।
'জার্নি বাই বোট' এবং সৃজনশীলতার অপমৃত্যু
সৃজনশীলতা বা ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নিয়ে আমরা অনেক আস্ফালন করলেও বাস্তবে আমরা শিক্ষার্থীদের মগজে মুখস্থ বিদ্যার বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছি। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পরীক্ষার খাতায় কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থীর একই ধরণের উত্তর। পাঠ্যবই বা গাইড বইয়ের মুখস্থ বুলি আউড়ানোই এখন মেধার মাপকাঠি। আমাদের পদ্ধতিটি কতটা হাস্যকর, তা লেখকের একটি পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
"বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী সবাই একই নদীতে রওনা দিয়েছিল কোন একদিন এবং তার ওই একই নদীতে একই অনুভূতি একই ভাষা কারণ এটাকেও লিখে দিয়েছে।"
এই মুখস্থের সংস্কৃতি কেবল রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; পরীক্ষার হলে কে কতগুলো ‘অতিরিক্ত উত্তরপত্র’ বা ‘এক্সট্রা পেপার’ নিতে পারল, তার ওপর ভিত্তি করে মেধা যাচাইয়ের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক উন্মাদনা প্রকৃত সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করছে। আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা কেবল তথ্য পুনরুৎপাদন করতে পারে, কিন্তু মৌলিক চিন্তা করতে জানে না।
জিপিএ-৫ এর মরীচিকা ও বিষণ্ণ তারুণ্য
গ্রেডিং সিস্টেম বা জিপিএ পদ্ধতি আজ আমাদের কিশোর ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বিশ্বে যেখানে জিপিএ-এর সর্বোচ্চ মান ৪, সেখানে আমাদের দেশে ৫-এর এক অবাস্তব ও কৃত্রিম প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে। এই জিপিএ-৫ এর মোহ থেকে জন্ম নিয়েছে 'গোল্ডেন জিপিএ'-র মতো বৈষম্যমূলক বিভাজন।
এই নম্বরের চাপে পিষ্ট হয়ে যখন একজন কিশোর তার কাঙ্ক্ষিত গ্রেড পায় না, তখন সে নিজেকে চরম ব্যর্থ মনে করে। এই বিষণ্ণতা ও ব্যর্থতার গ্লানি সহ্য করতে না পেরে অনেক মেধাবী প্রাণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। শিক্ষা যেখানে জীবনকে বিকশিত করার কথা ছিল, সেখানে তা জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গোল্ডেন জিপিএ-র এই মরীচিকা আমাদের তরুণদের শৈশব ও কৈশোরকে কেড়ে নিয়ে তাদের এক পঙ্গু প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গডজিলা, কিং কং এবং সামাজিক শিক্ষার অভাব:
প্রথাগত শিক্ষা বা সার্টিফিকেট থাকলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয় না, যদি না তার মধ্যে সামাজিক ও আচরণের শিক্ষা থাকে। আমাদের স্কুল-কলেজগুলো জিপিএ-৫ উৎপাদন করতে পারলেও সুনাগরিক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। রাজধানীর গণপরিবহন বা রাজপথের দিকে তাকালে এই ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ঢাকা শহরের লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলোর জীর্ণ দশা দেখলে মনে হয়, এগুলো কোনো যান্ত্রিক বাহন নয়, বরং কোনো হিংস্র দানবের আক্রমণের শিকার। বাসের গায়ে অসংখ্য আঁচড় আর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অংশগুলো দেখলে মনে হতে পারে যে এ দেশে হয়তো ‘গডজিলা’ কিংবা ‘কিং কং’ এসেছিল এবং তারা কামড়ে বাসগুলোকে এমন ক্ষতবিক্ষত করেছে। মূলত, বাসের ছাদে চড়া কিংবা গণপরিবহনের প্রতি এই যে সহিংস ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, তা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অসারতাকেই প্রমাণ করে। এই রঙহীন, বৈচিত্র্যহীন ও শ্রীহীন নগরী আমাদের ব্যর্থ ও কল্পনাশক্তিহীন শিক্ষারই এক বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের গন্তব্য কোথায়?
বর্তমান সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের একটি মানবতাবাদী ও আচরণগত শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। ডিগ্রি বা জিপিএ-র চেয়েও বড় হওয়া উচিত মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা। আমরা যদি কেবল ভালো নম্বর পাওয়া যন্ত্র তৈরি করতে থাকি, তবে সমাজ থেকে এই নৈরাজ্য আর শ্রীহীনতা কোনোদিনও দূর হবে না। আমাদের ভাববার সময় এসেছে—আমরা কি সন্তানদের শিক্ষিত করছি, নাকি কেবল একটি প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল করছি?
No comments
Thank you, best of luck