শেয়ার বাজার কি আসলেই জুয়া? ৫টি তথ্যাশ্রয়ী সত্য যা আপনার বিনিয়োগের ধারণা বদলে দেবে
শেয়ার বাজারের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।। শিক্ষানবিসদের জন্য নির্দেশিকা।।
Share Market Important Terms Explained in Bangla।। Beginner Guide।।
১. একটি ভ্রান্ত ধারণার অবসান:
আমাদের আশেপাশে অগণিত মানুষ শেয়ার বাজারে আসেন ‘তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার’ আকাশকুসুম কল্পনা নিয়ে। অনেকের কাছেই এটি একটি বৈধ জুয়া খেলার আখড়া। কিন্তু এই ধারণার গভীরে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের তাত্ত্বিক ভুল। বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা যাক—সবাই যদি কেবল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রাতারাতি সম্পদশালী হয়ে যেত, তবে সমাজে উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়ত এবং মুদ্রার চরম অবমূল্যায়ন ঘটত। শেয়ার বাজার আসলে জুয়া নয়, বরং এটি হচ্ছে তাদের জন্য ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের এক অনন্য সুযোগ, যারা সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করতে অক্ষম বা যাদের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।
বিশ্ববিখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের মতে, একজন সাধারণ স্কুল পাস ছেলেও সফল বিনিয়োগকারী হতে পারেন, যদি তিনি আবেগতাড়িত না হয়ে সঠিক বিচারবুদ্ধি বা ‘বেসিক সেন্স’ খাটিয়ে বিনিয়োগ করেন। শেয়ার বাজারকে বুঝতে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর ডিগ্রির চেয়ে নিয়মানুবর্তিতা এবং তথ্যের বিশ্লেষণ অনেক বেশি কার্যকর।
২. শেয়ার মানে কেবল কাগজ নয়, এটি ব্যবসার অংশীদারিত্ব:
শেয়ারের গূঢ় অর্থ হলো একটি ব্যবসার মালিকানার ক্ষুদ্রতম একক। উদাহরণস্বরূপ, ধরুন একটি কোম্পানির মোট ৪০০ কোটি টাকা মূলধন প্রয়োজন (যার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা উদ্যোক্তাদের আছে এবং বাকি ৩০০ কোটি টাকা সংস্থান করা প্রয়োজন)। এই বিশাল অংকের মূলধনকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিটে ভাগ করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিটি ইউনিটের মূল্য বা ‘ফেস ভ্যালু’ (Face Value) সাধারণত ১০ টাকা নির্ধারিত। এই যে মূলধনের ক্ষুদ্রতম অংশ বা পার্টনারশিপের একক, সেটিই হলো শেয়ার। সুতরাং, আপনি যখন শেয়ার কিনছেন, আপনি আসলে ওই কোম্পানির ব্যবসার একজন অংশীদার হচ্ছেন।
মানুষ এটাকে জুয়া মনে করে কারণ তারা ব্যবসার মৌলিক ভিত্তি না বুঝে কেবল দরের উত্থান-পতনের পেছনে ছোটে। অথচ একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে শেয়ার বাজারের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের অর্থনীতির স্থায়ী উন্নয়ন আশা করা যায় না। এটি অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।"
৩. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের গুরুত্ব: উইলিয়াম জে ও'নিল এর দর্শন:
একটি কোম্পানিতে কারা বিনিয়োগ করছে, তা পর্যবেক্ষণ করা একজন সচেতন বিনিয়োগকারীর অন্যতম প্রধান কাজ। বাংলাদেশের বাজারে সাধারণত পাঁচ ধরনের শেয়ারহোল্ডার দেখা যায়: স্পন্সর (উদ্যোক্তা), সরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক (ইনস্টিটিউট), বিদেশি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারী (পাবলিক)। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, উদ্যোক্তা বা স্পন্সরদের সাধারণত ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হয়।
বিখ্যাত বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম জে ও'নিল তার দর্শনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (Institutional Investors) গতিবিধি পর্যবেক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ গবেষণার পর বিনিয়োগ করেন। যদি কোনো কোম্পানিতে দেখা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক এবং বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত নগণ্য, কিন্তু পাবলিক শেয়ারের পরিমাণ অত্যধিক—তবে বুঝতে হবে পেশাদার বিনিয়োগকারীরা ওই কোম্পানির ওপর যথেষ্ট আস্থাশীল নন। এমন কোম্পানিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হুজুগে পড়ে ‘ঝাঁপিয়ে পড়া’ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৪. পি/ই রেশিও (P/E Ratio): ‘পয়সা দিয়ে টেনশন কেনা’ কি বুদ্ধিমানের কাজ?
বিনিয়োগের যৌক্তিকতা বিচারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো পি/ই রেশিও (Price-Earnings Ratio)। একটি শেয়ারের বর্তমান বাজার মূল্যকে তার বার্ষিক আয় (EPS) দিয়ে ভাগ করলে এই রেশিও পাওয়া যায়। ধরুন একটি শেয়ারের পি/ই রেশিও ৪০। এর সহজ অর্থ হলো, কোম্পানিটি যদি বর্তমান হারে মুনাফা করতে থাকে, তবে আপনার বিনিয়োগ করা টাকা ওই লভ্যাংশ থেকে উঠে আসতে ৪০ বছর সময় লাগবে।
২০১০ সালের শেয়ার বাজার ধসের সময় অনেক সাধারণ মানুষ ৮০ বা তারও বেশি পি/ই-তে শেয়ার কিনেছিলেন। এর মানে তারা এমন এক ব্যবসায় লগ্নি করেছিলেন যা থেকে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পেতে ৮০ বছর অপেক্ষার প্রয়োজন ছিল! বিশেষজ্ঞের ভাষায়, উচ্চ পি/ই রেশিওতে শেয়ার কেনা মানে হলো ‘পয়সা দিয়ে টেনশন কেনা’। পি/ই রেশিও যত কম হবে, বিনিয়োগ তত নিরাপদ বলে গণ্য হয়। তবে একটি ‘প্রো-টিপ’ মনে রাখা জরুরি: যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম হয় এবং আয়ের প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় থাকে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কিছুটা উচ্চ পি/ই-ও যৌক্তিক হতে পারে।
৫. ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়: ক্যাপিটাল গেইন:
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ থেকে আয়ের দুটি পথ আছে— লভ্যাংশ (Dividend) এবং মূলধনী মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইন (Capital Gain)। যখন আপনি কোনো শেয়ার যে দামে কিনেছেন তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন, তখন তাকে ক্যাপিটাল গেইন বলে। যেমন: ২০ টাকায় কেনা শেয়ার ৩০ টাকায় বিক্রি করলে আপনার ১০ টাকা ক্যাপিটাল গেইন হলো।
বাংলাদেশের ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি তথ্যাশ্রয়ী চমকপ্রদ তথ্য হলো, বছরে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাপিটাল গেইন বা মূলধনী মুনাফা সম্পূর্ণ করমুক্ত। এটি সাধারণ মানুষের জন্য সম্পদ বৃদ্ধির এক বিশাল আইনি সুযোগ। তথ্যের অভাবে অনেকেই এই সুবিধার কথা জানেন না এবং অযথা ঝুঁকি নিয়ে মূলধন হারান।
৬. আপনার সুরক্ষা কবজ: সার্কিট ব্রেকার এবং ৫২ সপ্তাহের রেঞ্জ
বাজারের অস্বাভাবিক অস্থিরতা থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রক্ষায় ‘সার্কিট ব্রেকার’ একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের বাজারে বর্তমানে কোনো শেয়ারের দাম একদিনে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে (আপার সার্কিট) বা কমতে (লোয়ার সার্কিট) পারে। এটি বাজারকে আকস্মিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
এছাড়া শেয়ার কেনার আগে '৫২ উইকস হাই/লো' বা এক বছরের মূল্যসীমা দেখা অপরিহার্য। যদি কোনো শেয়ার ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ মূল্যের কাছাকাছি অবস্থান করে, তবে বিনিয়োগের আগে নিচের চেকলিস্টটি মিলিয়ে নিন:
কোম্পানির ব্যবসায় কি বাস্তবসম্মত কোনো নতুন প্রবৃদ্ধি (Growth) হয়েছে?
ভবিষ্যতের জন্য কি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রজেক্ট বা যৌক্তিক ফিউচার প্রজেকশন আছে?
বর্তমান বর্ধিত মূল্য কি কোম্পানির আয়ের তুলনায় ‘জাস্টিফাইড’ বা যৌক্তিক?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে কেবল দাম বাড়ছে দেখেই সেই শেয়ারে প্রবেশ করা আত্মঘাতী হতে পারে।
৭. তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগই হোক মূলমন্ত্র:
শেয়ার বাজার কোনো জাদুর কাঠি নয় যে আজ টাকা জমা দিলেই কাল তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এটি একটি ধৈর্য ও গভীর বিচারবুদ্ধির স্থান। স্রেফ গুজবে কান দিয়ে বা হুজুগে পড়ে 'রানিং ট্রেনে' (হঠাৎ লাফিয়ে বাড়তে থাকা শেয়ার) উঠতে গিয়েই সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত মূলধন হারায়। স্বল্পমেয়াদী ‘ডে ট্রেডিং’ বা জুয়ার মানসিকতা পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পথে হাঁটলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়।
পরিশেষে একটি প্রশ্ন আপনার কাছে: আপনি কি তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে একটি স্বচ্ছ ব্যবসার অংশীদার হতে চান, নাকি অন্ধভাবে টাকা ঢেলে ভাগ্যের ওপর জুয়া খেলতে চান? সিদ্ধান্ত আপনার।
No comments
Thank you, best of luck