৩১ মার্চের সেই রক্তঝরা দুপুর: সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের মর্মন্তুদ সত্য
এক শান্ত প্রাঙ্গণে বারুদের গন্ধ ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল ইতিহাসের পাতায় এক দহনময় অধ্যায়। ঢাকার আকাশে তখন বারুদের গন্ধ, চারদিকে মৃত্যুর বিভীষিকা আর মানুষের চোখে এক গভীর অনিশ্চয়তা। ২৬শে মার্চের সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক। ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুলের শান্ত প্রাঙ্গণটিও সেদিন এই শঙ্কা থেকে মুক্ত ছিল না। ব্রাদার হোবার্ট আর ব্রাদার রবার্টের মনে দানা বেঁধেছিল এক অশুভ আশঙ্কা। ব্যালকনি থেকে তারা দেখছিলেন চারদিকের অস্থিরতা, কিন্তু জ্ঞানালয়ের এই পবিত্র আঙিনায় যে এমন নিষ্ঠুরতা নেমে আসবে, তা ছিল কল্পনারও অতীত। সেই রক্তঝরা দুপুরের ঘটনাগুলো আজও ইতিহাসের এক না বলা ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মিশনারি প্রপার্টি কি নিরাপদ ছিল? স্কুলের প্রধান ফটক বন্ধ রেখে ব্রাদাররা এক অস্থির সময় পার করছিলেন। তাদের মনে একটি দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এটি একটি 'মিশনারি প্রপার্টি' হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী এখানে হামলা করার সাহস পাবে না। স্কুলের 'দার্জিলিং বিল্ডিং'-এর নিচে তখন আশ্রয় নিয়েছে বেশ কিছু ভীত-সন্ত্রস্ত পরিবার। ব্রাদাররা তাদের অভয় দিচ্ছিলেন, বুকের ক্রুশটা আঁকড়ে ধরে ভাবছিলেন—ঈশ্বর নিশ্চয়ই তাদের রক্ষা করবেন। এমন সময় একটি ভারী যান্ত্রিক শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। একটি বড় মিলিটারি ট্রাক স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে চলে গেল। ট্রাকের ওপর বসানো মেশিনগানের কালো নলটিতে সূর্যের আলোটাও যেন ভয় পেয়ে চক্ চক্ করছিল। ট্রাকটি চলে যেতে দেখে ব্রাদার রবার্ট এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু সেই 'মিথ্যা স্বস্তি' দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কিছুক্ষণ পরেই ট্রাকটি ফিরে এসে ঠিক স্কুলের গেটের সামনেই থামল। উন্মত্ত এক অফিসার যখন ভেতরে ঢোকার হুকুম দিল, তখন ব্রাদার রবার্ট মরিয়া হয়ে শেষবারের মতো নিজের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে এক করুণ আর্তি জানিয়েছিলেন:
"ব্রাদার রবার্ট দিস ইজ আ মিশনারি প্রপার্টি। উই হ্যাভ নো রিলেশন উইথ পলিটিকাল ইনসিডেন্টস।"
'রুটিন চেক'-এর আড়ালে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ৩১শে মার্চ, বুধবার দুপুর। স্কুলের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই জলপাই রঙের ঘাতক যান। একজন অফিসার অত্যন্ত সুকৌশলে একে 'রুটিন চেক' বা সাধারণ তল্লাশি হিসেবে অভিহিত করে। তার চেহারায় ছিল এক কৃত্রিম 'সৌম্য ভদ্রতা', যা ব্রাদারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিল যে তারা কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু গেট খোলার সাথে সাথেই সেই ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়ে। জনাদশেক মিলিটারি ভেতরে ঢুকে স্কুলের 'জলের কলটার' (water tap) সামনে পজিশন নিল। মুহূর্তেই শান্ত প্রাঙ্গণটি একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। তারা অভিযোগ তুলল, ভেতরে মানুষ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই তথাকথিত তল্লাশির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক চরম প্রতারণা এবং এক সুপরিকল্পিত নিধনের নীলনকশা।
লক্ষ্য যখন শিক্ষক ও আগামী প্রজন্ম সেনাবাহিনী মিনিট দশেকের মধ্যে বকুলতলায় জড়ো করল প্রায় তিরিশজন মানুষকে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে সেই 'ভদ্র চেহারার' অফিসারের হুকুম শোনা গেল— "Take them all." সেই দলে ছিলেন দুই নিষ্ঠাবান শিক্ষক—এনসি সূত্রধর স্যার এবং ডিএন পাল চৌধুরী স্যার। সেই সাথে ধরা হয়েছিল ডিএন পাল স্যারের দুই তরুণ পুত্র, মেধাবী গ্রেগোরিয়ান শৈবাল ও উৎপলকে।
একটি জাতিকে মেধাশূন্য করে দিতে শিক্ষক ও প্রতিভাবান ছাত্ররাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্রাদার হোবার্ট এবং ব্রাদার রবার্ট বারবার তাদের নির্দোষ বলে মুক্তি প্রার্থনা করলেও কোনো কাজ হয়নি। ব্রাদারদের অসহায় চোখের সামনেই তাদের পিঠে রাইফেলের কুঁদোর ধাক্কা দিয়ে ট্রাকে তোলা হলো। ট্রাকটি যখন চলতে শুরু করল, ব্রাদাররা সেটির পেছন পেছন অনেকটা পথ দৌড়েছিলেন। কিন্তু একরাশ কালো ধোঁয়া আর প্রিয়জনদের হারানোর হাহাকার বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে ট্রাকটি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। সেই রাতেই জগন্নাথ কলেজের ক্যাম্পে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
বদলে যাওয়া প্রাঙ্গণ এবং এক জাগ্রত বিবেক আজকের সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের প্রাঙ্গণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সেই সময়ের 'দার্জিলিং বিল্ডিং' আজ আর নেই, তার বদলে দাঁড়িয়েছে নতুন ইমারত। যেখানে এক সময় জলের কল আর সেই ছায়াসুনিবিড় বকুলতলা ছিল, তা না থাকলে সম্প্রতি সেখানে একটি বকুল গাছ লাগানো হয়েছে। যে গাছে আবার ৭১ এর সুবাস ছাড়াতে শুরু করেছেন। শিক্ষালয়ে আজ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি রক্তলাল শহীদ মিনার। এই স্কুলটি বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মতো কৃতি সন্তানদের ধাত্রীভূমি। খেলার মাঠে আজও ধুলো উড়ে, সেন্ট গ্রেগরীর ছেলেরা আজও দাপিয়ে বেড়ায়; কিন্তু বকুলতলার সেই শহীদদের অনুপস্থিতি আজও প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।
"ইতিহাস ভুলে গেলে ইতিহাস নিজেই প্রতিশোধ নেয়।"
স্মৃতির প্রদীপ এবং একটি প্রশ্ন ৩১শে মার্চের সেই দুপুরটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ত্যাগের এক বিশাল উপাখ্যান। শিক্ষক ও ছাত্রদের সেই রক্ত বৃথা যায়নি; তা পরবর্তীতে আমাদের স্বাধীনতার অমোঘ প্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছিল। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো তারা হয়তো শরীরে ফিরে আসেননি, কিন্তু স্বাধীন দেশের প্রতিটি নিঃশ্বাসে তারা বেঁচে আছেন। শহীদদের স্মৃতির প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব আজকের প্রতিটি নাগরিকের।
আজকের এই বদলে যাওয়া আধুনিক প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমরা কি সেই বকুলতলার শহীদদের আর্তনাদ শুনতে পাই, নাকি উন্নয়নের ভিড়ে আমরা ইতিহাসকেই ভুলে যাচ্ছি? আজকের সেন্ট গ্রেগরীর ছেলেরা কি জানে তাদের পায়ের তলার এই মাটি কতটা রক্তস্নাত?
No comments
Thank you, best of luck