তোতা-কাহিনি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।। সপ্তম শ্রেণি (মাধ্যমিক)।। আনন্দপাঠ ।। NCTB BOOK।।
১.
এক যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, কিন্তু জানিত না কায়দা-কানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, 'এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।'
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, 'পাখিটাকে শিক্ষা দাও।'
২.
রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে, সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া। রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।
৩.
স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, 'শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।' কেহ বলে, 'শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল!'
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, 'অল্প পুথির কর্ম নয়।'
ভাগিনা তখন পুথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, 'সাবাস! বিদ্যা আর ধরে না।'
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, 'উন্নতি হইতেছে।'
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্দুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠা-বালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।
8.
সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, 'খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।'
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, 'ভাগিনা, এ কী কথা শুনি!'
ভাগিনা বলিল, 'মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।'
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।
৫.
শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরি ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, 'মহারাজ কাওটা দেখিতেছেন!'
মহারাজ বলিলেন, 'আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।'
ভাগিনা বলিল, 'শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।'
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া,
সে বলিয়া উঠিল, 'মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।'
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, 'ওই যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।'
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, 'পাখিটাকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।'
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চিৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।
৬.
পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝটপট করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, 'এ কী বেয়াদবি।'
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, 'এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।'
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাও করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।
৭.
পাখিটা মরিল। কোনকালে যে কেউ তার ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, 'পাখি মরিয়াছে।'
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, 'ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।'
ভাগিনা বলিল, 'মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।'
রাজা শুধাইলেন, 'ও কি আর লাফায়।'
ভাগিনা বলিল, 'আরে রাম!'
'আর কি ওড়ে।'
'না।'
'আর কি গান গায়।'
'না।'
'দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।'
'না।'
রাজা বলিলেন, 'একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।'
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল।
রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুথির শুকনো পাতা খসখস গজগজ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।
লেখক-পরিচিতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দে (৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। বাল্যকালেই তাঁর কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা। কবিতা, উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গান অর্থাৎ সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ। তাঁর অজস্র রচনার মধ্যে 'মানসী', 'সোনার তরী', 'চিত্রা', 'কল্পনা', 'বলাকা', 'পুনশ্চ', 'চোখের বালি', 'গোরা', 'ঘরে-বাইরে', 'শেষের কবিতা', 'বিসর্জন', 'ডাকঘর', 'রক্তকরবী', 'গল্পগুচ্ছ', 'বিচিত্র প্রবন্ধ', 'কালান্তর' ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে (৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) আশি বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব
একবার 'মূর্খ' তোতা পাখির শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন রাজা। রাজার ভাগিনাদের ওপর দেওয়া হলো সেই শিক্ষার ভার। ডাকা হলো রাজপণ্ডিতদের। নানা আলোচনা শেষে তারা সিদ্ধান্ত জানালেন, সামান্য খড়কুটো দিয়ে পাখিটি যে-বাসা বাঁধে, সে-বাসা অধিক বিদ্যাধারণের উপযুক্ত নয়। তাই রাজপণ্ডিতদের পরামর্শ অনুযায়ী পাখির জন্য নির্মিত হলো সোনার খাঁচা। অপূর্ব সে খাঁচা দেখার জন্য দেশ-বিদেশের লোক ঝুঁকে পড়ল। এরপর পণ্ডিত মশাই এলেন পাখিকে বিদ্যা শেখাতে। পুথি-লেখকরা পুথির নকল করে করে বিশাল স্তূপ তৈরি করল। বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি চলল খাঁচাটার মেরামত ও মেরামতের তদারকি। পাখির শিক্ষা-কার্যক্রম স্বচক্ষে দেখতে চাইলেন রাজা। পাত্র-মিত্র-অমাত্য নিয়ে রাজা শিক্ষাশালায় উপস্থিত হলেন। অমনি বেজে উঠল নানা বাদ্যযন্ত্র। রাজার শিক্ষাশালায় আসার মূল উদ্দেশ্যই ঢাকা পড়ে গেল রাজাকে স্বাগত জানাবার এমন হুলুস্থুল আয়োজনে। এদিকে, শিক্ষার চাপে পাখিটি ধীরে ধীরে আধমরা হয়ে এল। একদিন দেখা গেল, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়ে খাঁচার শিক কাটবার চেষ্টা করছে। পাখির এ 'বেয়াদবি' দেখে ক্ষিপ্ত কোতোয়াল ডেকে আনল কামারকে। এবার পাখির জন্য তৈরি হলো শিকল, কাটা পড়ল ডানা। পণ্ডিতেরাও এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি নিয়ে শিক্ষা দিতে উদ্যত হলো। অবশেষে পাখিটা মারা গেল।
শিক্ষার স্বাভাবিক পথকে রুদ্ধ করে বাড়াবাড়ি রকমের আয়োজন ও জবরদস্তিটাই তোতা-কাহিনিতে করুণরূপে ফুটে উঠেছে। এ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অপশিক্ষার প্রতিফলকে পাখির মৃত্যুর রূপকে তুলে ধরেছেন।
শব্দার্থ ও টীকা
শাস্ত্র - বিশেষ বিদ্যা বা গ্রন্থ।
অবিদ্যা - অজ্ঞতা।
দক্ষিণা - পারিশ্রমিক, প্রণামী।
স্যাকরা - স্বর্ণকার।
হদ্দমুদ্দ - চেষ্টার শেষ পর্যন্ত, যতদূর সম্ভব।
নস্য – তামাকের গুঁড়া।
তলব - ডাকা।
পুথি - পুস্তক, হাতে লেখা বই।
নকল - অনুলিপি।
পর্বতপ্রমাণ - পাহাড়ের সমান।
পারিতোষিক - পুরস্কার, পারিশ্রমিক।
খবরদারি - তত্ত্বাবধান করা।
পালিশ - চকচকে করা।
তনখা - টাকা, মুদ্রা। -
খুড়তুতো - চাচাতো, কাকাতো।
মাসতুতো - মাসি বা খালার সন্তান।
কোঠা - বালাখানা-পাকা ঘর, প্রাসাদ।
নিন্দুক - নিন্দা করে যে, গল্পে সত্যবাদী অর্থে। -
তদারক - তত্ত্বাবধান, খবরদারি।
স্বয়ং - নিজ।
অমাত্য - মন্ত্রী।
তুরি - বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, রণশিঙ্গা, বিউগল। -
ভেরি - বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, ঢাক।
দেউড়ি - সদর দরজা।
জগঝম্প - জয়ঢাক, প্রাচীন রণবাদ্য বিশেষ।
তদারকনবিশ - তত্ত্বাবধানকারী।
ভদ্র - দস্তুর মতো
শিষ্ট - প্রথা অনুযায়ী।
রোমাঞ্চ - শিহরন।
সড়কি - বর্শা, বল্লম।
কোতোয়াল - প্রহরী, নগর-রক্ষক।
হাপর - চুল্লিতে বাতাস দেওয়ার জন্য নলযকু থলি।
ঠাহর - টের পাওয়া, অনুভব করা।
কিশলয় - গাছের কচি পাতা, নতুন পাতা।
মুকুলিত - যা আধফুটন্ত বা যা কুঁড়িতে পরিণত হয়েছে।
১.
(ক) নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।—ভাগিনারা রাজাকে একথা কেন বলল? (৩)
প্রথমত, ভাগিনারা নিজেদের দোষ ঢাকতে এবং নিজেদের কাজকে সঠিক প্রমাণ করতে এই কথা বলেছিল। তারা পাখির প্রকৃত শিক্ষার দিকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে খাঁচা বানানো, পুথি লেখা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত ছিল। ফলে পাখির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল।
দ্বিতীয়ত, যখন নিন্দুকরা সত্য কথা বলে যে পাখির কোনো খোঁজ রাখা হচ্ছে না, তখন ভাগিনারা সেই সমালোচনা সহ্য করতে পারেনি। তাই তারা রাজাকে বোঝাতে চেয়েছে যে নিন্দুকরা হিংসা থেকে এসব কথা বলছে। মূলত নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতেই তারা এমন কথা বলেছে।
১. (খ) জোরপূর্বক শিক্ষাদান করলে পরিণতি ভালো হয় না।—মন্তব্যটির সত্যতা নির্ণয় করো। (৭)
তোতাকাহিনি গল্পে আমরা দেখি, পাখিটিকে জোর করে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাকে স্বাভাবিকভাবে শেখানোর বদলে খাঁচায় বন্দি করে পুথির পাতা মুখে ঢোকানো হয়। এতে পাখির স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় এবং সে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পাখিটির মৃত্যু ঘটে। এটি প্রমাণ করে যে জোরপূর্বক শিক্ষা কখনোই সফল হয় না।
এছাড়া বাস্তব জীবনেও দেখা যায়, যদি কোনো শিক্ষার্থীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপ দিয়ে পড়ানো হয়, তবে সে পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ভয় বা চাপের মধ্যে শেখা জ্ঞান স্থায়ী হয় না। বরং শিক্ষার প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়।
সুতরাং, শিক্ষাকে আনন্দময় ও স্বাভাবিক পদ্ধতিতে দিতে হয়। জোর করে শিক্ষা দিলে তা শিক্ষার্থীর জন্য ক্ষতিকর হয় এবং প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না—এ কথা সম্পূর্ণ সত্য।
২.
(ক) এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।—এতে কী বোঝানো হয়েছে? (৩)
প্রথমত, এই উক্তির মাধ্যমে শাসকদের ভুল ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। তারা মনে করে পাখিটি তাদের দেওয়া শিক্ষা গ্রহণ না করায় সে বোকা ও অকৃতজ্ঞ। অথচ প্রকৃতপক্ষে পাখির উপর জোর করে অত্যাচার করা হচ্ছিল।
দ্বিতীয়ত, এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য। এখানে বোঝানো হয়েছে, শাসকরা নিজেদের ভুল বুঝতে না পেরে দোষ চাপিয়েছে পাখির ওপর। অর্থাৎ, তারা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে পাখিকেই দোষী করেছে।
২.
(খ) আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ভাগিনারা পাখিটার পিছনে অযৌক্তিক খরচ করেছে।—মূল্যায়ন করো। (৭)
তোতাকাহিনি গল্পে ভাগিনাদের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা পাখির শিক্ষার নামে অপ্রয়োজনীয় নানা আয়োজন করেছে। সোনার খাঁচা তৈরি, অসংখ্য পুথি লেখা, কর্মচারী নিয়োগ—সবকিছুই ছিল বাহুল্যপূর্ণ। এসব কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু পাখির প্রকৃত উন্নতির জন্য কিছুই করা হয়নি।
এ থেকে বোঝা যায়, ভাগিনারা প্রকৃতপক্ষে নিজেদের লাভের কথা চিন্তা করেছে। বিভিন্ন কাজে অনেক লোক নিয়োগ দিয়ে এবং নানা খাতে খরচ দেখিয়ে তারা অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ পেয়েছে। তাদের আত্মীয়স্বজনরাও এই কাজে যুক্ত হয়ে লাভবান হয়েছে।
অতএব, বলা যায় যে ভাগিনারা পাখির শিক্ষার আড়ালে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছে। তাই উক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
৩.
(ক) মহারাজ কাণ্ডটা দেখিতেছেন!—কে, কোন প্রসঙ্গে, কেন বলেছে? (৩)
প্রথমত, এই উক্তিটি রাজার ভাগিনা বলেছিল। যখন রাজা শিক্ষাশালায় উপস্থিত হন, তখন চারদিকে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ এবং নানা কর্মব্যস্ততা চলছিল।
দ্বিতীয়ত, ভাগিনা রাজাকে এসব দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছিল যে পাখির শিক্ষা খুব জোরেশোরে চলছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি অভিনয়, যাতে রাজা সন্তুষ্ট হন। তাই তিনি এই কথাটি বলেন।
৩. (খ) তোতাকাহিনি গল্পে রাজা অত্যন্ত সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন।—মন্তব্যটির সত্যতা নির্ণয় করো। (৭)
তোতাকাহিনি গল্পে রাজা শুরুতে পাখির শিক্ষা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন, যা একটি ভালো দিক। কিন্তু তিনি বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই না করে সবকিছু অন্যদের ওপর ছেড়ে দেন। ভাগিনাদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি প্রকৃত সত্য জানতে চেষ্টা করেননি।
যখন নিন্দুকরা সত্য কথা বলে, তখনও রাজা তাদের কথা গুরুত্ব দেননি। বরং ভাগিনার কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পুরস্কৃত করেন। এমনকি শিক্ষার নামে পাখির উপর যে অত্যাচার হচ্ছিল, সেটিও তিনি বুঝতে পারেননি বা বুঝেও ব্যবস্থা নেননি।
অতএব, বলা যায় যে রাজা সুবুদ্ধির পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি যদি সঠিকভাবে বিষয়টি বিচার করতেন, তবে পাখির এই করুণ পরিণতি হতো না। তাই মন্তব্যটি সঠিক নয়।
৪.
(ক) পাখিকে শিক্ষা দেওয়ার সব আয়োজন ব্যর্থ হয় কেন? (৩)
প্রথমত, পাখিকে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়নি। তাকে খাঁচায় বন্দি করে জোর করে পুথির পাতা খাওয়ানো হয়েছে, যা শিক্ষার সঠিক পদ্ধতি নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার পরিবর্তে বাহ্যিক আয়োজনেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে পাখির প্রকৃত উন্নতি হয়নি। এই কারণেই সব আয়োজন ব্যর্থ হয়েছে।
৪.
(খ) তোতাকাহিনি গল্পের নিন্দুক চরিত্রটি বর্ণনা করো। (৭)
তোতাকাহিনি গল্পের নিন্দুক চরিত্রটি আসলে সত্যবাদী ও সচেতন একজন ব্যক্তি। তিনি অন্যদের মতো ভণ্ডামি বা তোষামোদ করেন না। বরং পাখির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তিনি সঠিক কথা বলেন।
গল্পে দেখা যায়, যখন সবাই খাঁচা ও শিক্ষার বাহ্যিক দিক নিয়ে ব্যস্ত, তখন নিন্দুকই একমাত্র ব্যক্তি যে পাখির দুরবস্থার কথা তুলে ধরে। সে রাজাকে প্রশ্ন করে—পাখিটাকে তিনি দেখেছেন কি না। এই প্রশ্নের মাধ্যমে সে আসল সমস্যাটি সামনে আনে।
বাস্তব জীবনেও এমন অনেক মানুষ থাকে, যারা সত্য কথা বলে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। যদিও অনেক সময় তাদের নিন্দুক বলা হয়, কিন্তু তারা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলা যায়, এই চরিত্রটি সত্য ও ন্যায়বোধের প্রতীক।
No comments
Thank you, best of luck